ফিরনাসের উপলব্ধি

 "ফিরনাসের উপলব্ধি"

আলোকবীজ

পর্ব-০১

তারিখ: ০১|০৮|২০২৬ইং


সোনালীপুর একটি সুন্দর গ্রাম ৷ সবুজে সমারোহ তার চারিপাশ ৷ মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠা শত শত পরিবার ৷ স্নিগ্ধ পরিবেশে মুগ্ধ না হয়ে পারে না কেউ ৷ শীতের সকাল যেন এক ভিন্ন অনুভূতি ৷ রাস্তার দুই ধারে ঠাই দাঁড়ানো খেজুর গাছের সারি ৷ ঝুলে তার গলায় রসের হাড়ি ৷ এক চুমুকেই প্রাণটা জুড়িয়ে যায় ৷ গ্রীস্মের কড়া রৌদ্রের কিরণে যেন চোখ মেলাও দায় ৷ গরমের তীব্রতা উপলব্ধি করার পূর্বেই দেহের আবরণ ছুয়ে যায় শীতল হাওয়া ৷ বুঝাও মুশকিল যে, কোন ঋতুতে করে বসবাস ৷ বর্ষার দিনে খালে-বিলে করে পানি তৈ-তৈ ৷ মনে হয় যেন সমুদ্রের ছোট্ট ঢেউ আচড়ে পড়ছে তীরে ৷ সূর্যের লাল আভা পড়ছে পানির উপর যা সৃষ্টি করছে জোনাকির ঝিকিমিকি নাচের দৃশ্য ৷ এত সুন্দর পরিবেশকে ঘিরে নাম হলো তার সোনালীপুর ৷


সোনালীপুরের একটি সৌন্দর্য হলো— আলেম সমাজের উপস্থিতি ৷ সাধারণ শিক্ষিত এবং আরবি শিক্ষিতদের মাঝে রয়েছে দারুন মোহাব্বত ৷ গ্রামের মানুষজন অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন আলেম সমাজকে ৷ ঐ গ্রামে তিন যুবকের আলাদা একটি সম্মান আছে ৷ কারণ তারা সমাজের নানা সমস্যা সমাধানে যতেষ্ট ভূমিকা রাখেন ৷ তাদের একজন হলেন শাহিন ৷ তিনি ছিলেন একজন মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থী ৷ বর্তমান একটি মসজিদে ইমামতি করেন ৷ তার তিলাওয়াত অত্যন্ত সুন্দর ৷ তিনি খুব অমায়িক ও ভদ্র স্বভাবের ৷ সবার স্নেহের ভাজন ৷ আর একজন হলেন.............


পর্ব:০২

তারিখ: ০২|০৮|২০২৬ইং

আরেক জন হলেন নাহিদ ৷ সে গ্রামের মতিন মিয়ার ছেলে ৷ ছোট্ট থেকেই অনেক চেষ্টা করার পরও তাকে ভালো পড়াশুনা করাতে পারেননি ৷ পরবর্তীতে সে হাতের কাজ শিখে ৷ বর্তমান সে অর্থবিত্তশালী ৷ সে একা থাকতে মোটেও পছন্দ করে না ৷ সে গ্রামের সেই ইমাম শাহিনের ভালো একজন বন্ধুও বটে ৷ তাই সে বেশিরভাগ অবসর সময় তার সাথে কাটায় ৷ সে মোটামুটি অর্থবিত্তশালী হলেও মনে কোনো অহংকার নেই ৷ সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলেন এবং সামাজিক সহযোগিতামূলক কাজে নিজেকে জড়িত রাখেন ৷ 


অপরজন হলেন গ্রামের সেই ফিরনাস ৷ তার পিতা একজন ব্যবসায়ী ৷ তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল একজন ব্যক্তি ৷ ফিরনাসের পড়াশুনায় কোনো কমতি রাখেননি ৷ ফিরনাসের মেধাশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর ৷ সে সহজে পরিস্থিতির অবস্থান বুঝতে পারেন ৷ সে গ্রামের বাইরে বেশিরভাগ সময় ব্যক্তিগত কাজে কাটান ৷ তার আরবি ও বাংলা লাইনের উভয় দিক থেকে ভালো পড়াশুনা আছে ৷ সে এখন একটি ভালো চাকরীও করেন ৷ চাকরীর সুবাধে পূর্বের মতো গ্রামে সময় কাটাতে পারে না ৷ সে যখনই গ্রামে আসে তখনই বন্ধু শাহিনের সাথে দেখা করে ৷ তারা ছিল পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক এবং ফ্রি মাইন্ডেড ৷ ফিরনাস সাধারণত এখনিষ্ট আলেমদের খুবই পছন্দ করতেন ৷ চাকরীর এক বিশেষ ছুটিতে ফিরনাস গ্রামে আসে ৷ গাড়ি থেকে নেমে দেখছে ময়নাপুর স্টেশনে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে ৷ সময় তখন সকাল সাড়ে ১০টা বাজে ৷ ঐদিন বাজারবার ছিল ৷ তাই অত্যদিক কোলাহলপূর্ণ পরিবেশের অবস্থা সহজেই বুঝতে পারেন ৷ ময়নাপুর স্টেশন থেকে তার গ্রাম সোনালীপুর হেটে যেতে ১০ মিনিট সময় লাগে ৷ ফিরনাস রাস্তা পার হতেই..........


পর্ব-০৩

তারিখ: ১০|০৮|২০২৬ইং


ফিরনাস রাস্তা পার হতেই ডাক দিলেন গ্রামের হাকিম চাচা ৷ 

"ফিরনাস, কেমন আছো? অনেকদিন পর দেখলাম ৷ জ্বি, চাচা ৷ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ৷ আপনি কেমন আছেন? বলো না বাবা, আগের মতো চাষাবাদ হয় না ৷ সারের দাম বেড়ে গেছে ৷ ন্যায্য মূল্য পাই না ৷ সবমিলিয়ে একটু অসুবিধায় আছি আরকি ৷ ও.....! আচ্ছা, আপনি সরকারি ভাতা কিংবা কোনো সুযোগ-সুবিধা পান নাই? না..রে বাপ! চেষ্টা করেছিলাম ৷ কৃষকদের জন্য সরকারি ভাতার কার্ড ও সুবিধা পাওয়ার জন্য নিজের আইডি কার্ডের ফটোকপি এবং ছবিও জমা দিয়েছি ৷ কিন্তু কোনো কিছু পাইনি ৷ চাচা, কিছু মনে করো না ৷ এগুলো আসলে আপনাদের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে আপনাদের জন্য আসা ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাগুলো অসাধু ব্যক্তিরা নিজেদের আত্মীয় এবং দলীয় মানুষদের মাঝে ভাগ করে সব খেয়ে নিচ্ছে ৷ আপনাদের সহজ-সরল মনকে তারা ব্যবসা বানিয়েছে ৷ হ বাপ! আমরা তো অত কিছু বুঝি না ৷

আচ্ছা চাচা, আমার বাড়ি যেতে হবে ৷ অন্য সময় কথা বলব ৷ না..রে ! চল ৷ তোমাকে নাস্তা করায় ৷ অনেকদিন পর তোমাকে দেখলাম ৷ তোমার বাবাও আমাকে যতেষ্ট সহযোগিতা করে ৷ না চাচা, আমার সাধারণত দোকানে বসে তেমন কিছু খাওয়ার অভ্যাস নেই ৷ আসি, চাচা......."


ফিরনাস হাকিম চাচার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তার ডান পাশ দিয়ে হাটছিলেন ৷ একটু যেতেই পিছন থেকে ভেসে আসল বাজে একটি হর্নের শব্দ ৷ ফিরে তাকাতেই অটো রিক্সা পাশ দিয়ে কেটে গেল ৷ ফিরনাস একটু অস্বস্তি অনূভব করেন ৷ তার এই অস্বস্তি একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ যাইহোক, বাড়িতে ফিরে ফিরনাস একটু বিশ্রাম নিলেন ৷ বিকেল গড়ালে বের হয়ে পড়েন তার..........


পর্ব-০৪

তারিখ: ১২|০৮|২০২৬ইং


বিকেল গড়ালে বের হয়ে পড়েন তার প্রিয় বন্ধু শাহিনের সাথে দেখা করতে ৷ তখন আসরের সময় ৷ মসজিদে গিয়ে শাহিনের পিছনে জামাতে নামাজ আদায় করেন ৷ নামাজের সালাম ফিরানোর পর শাহিন মুসল্লিদের দিকে ফিরে ঘুরে বসেন ৷ তখন শাহিন তাসবীহ পাঠের সময় ফিরনাসের দিকে লক্ষ্য করলেন যে, সে একটু বিষন্ন অবস্থায় ৷ পরবর্তী দোয়া শেষে মুসল্লিগণ চলে যাওয়ার পর শাহিন ফিরনাসের সাথে সালাম বিনিময় শেষে জানতে চাইলেন—


"শাহিন: ফিরনাস, অনেকদিন পর দেখা ৷ কিন্তু আজ তোমাকে বিষন্ন মনে হচ্ছে ৷ তোমাকে তো পূর্বে কখনো এমনটি দেখিনি ৷ কিসে তোমাকে ভাবাচ্ছে বলবে ? 

ফিরনাস: হ্যাঁ বন্ধু, আজ একটু বিষন্নতা কাজ করছে ৷ আজ গাড়ি থেকে নামতেই চাচা হাকিম মিয়ার সাথে দেখা হয়েছে ৷ আলাপচারিতা থেকে উপলব্ধি করছি যে, দরিদ্র মানুষদের অধিকার আসলে কোথায় এবং তাদের ন্যায্য হকগুলো কে পূরণ করবে তা আমাকে ভাবায় ৷ 

শাহিন: কেন ? কী হয়েছে?

ফিরনাস: দরিদ্র মানূষরা একদিকে ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না ৷ সিন্ডিকেট ব্যবসা তাদের ন্যায্য মূল্য পেতে বাঁধার সৃষ্টি করছে ৷ অপরদিকে অসাধু রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে ৷ দেশের নাগরিক হিসেবে এবং চাষী হিসেবে সবচেয়ে বেশি তাদের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন ৷ কারণ তাদের পরিশ্রমের ফলেই আমরা আমাদের খাদ্যের যোগানটা মেটাতে পারি ৷ তারাও যদি আমাদের মতো চাকরী করতো এবং চাষাবাদে নিয়োজিত না রাখতো, তবে আমাদের টাকা দিয়েও খাদ্যের যোগান মেটানো সম্ভব হতো না ৷ নিজেদের অবস্থান থেকে চাষাবাদ করতে হতো ৷

শাহিন: সঠিক বলছ, বন্ধু ৷ তবে আমাদের কী-বা করার আছে ?

ফিরনাস: হুম ৷ তুমিও জানো যে, হাকিম চাচা অত্যন্ত গরীব ৷ চাষাবাদ করে কোনো রকম চলেন ৷ তাদের পরিস্থিতিও কী আমাদের হতে পারতো না! তাদের নিয়ে কে ভাবছে বলো?

শাহিন: বুঝলাম ৷ তবে মনে হচ্ছে না যে, তুমি কেবল এই বিষয়টি নিয়ে বিষন্ন ৷ অন্য কোনো সমস্যা?

ফিরনাস: ঠিক ধরেছো...........

Comments