সেই দিনের একটি ভয়াবহ মুহূর্ত
পৃথিবীর মাঝে ভালোবাসা আর ঘৃণার একটা দিক থাকলেও ভালোবাসার দিকটা অন্যরকম ৷ সামান্য ভালোবাসার কারণে পৃথিবীতে পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের জন্য জীবন বাজি রাখে ৷ কাছের কিংবা দূরের অনেকে অনেক মানুষের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকে ৷ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বে পরস্পর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার অবসান ঘটে না সহজে ৷ এমনকি এমনও হয় যে, একজন অপরিচিতের ভালোবাসায় সিক্ত হতে হয় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ৷ এই মুহাব্বতের কারণে কত ট্রাজেডি ঘটনার সূচনা হচ্ছে প্রতিনিয়ত ৷ কিন্তু, এই ভালোবাসা মুহূর্তের মাঝে যেন বিলিন হয়ে যাবে সেই দিন ! কখনো যে এই ভালোবাসার অস্তিত্ব ছিল তার কোনো প্রমাণ মিলবে না ৷ সেই দিনের একটি মুহূর্ত কতই না ট্রাজেডি হবে তা কল্পনাতীত ! আর সে মুহূর্তটা হল কিয়ামতের দিনের একটি ভয়াবহ মুহূর্ত ! আর ওই দিনের একটি বিশেষ ভয়াবহ মুহূর্তের কথা পবিত্র কুরআন মাজিদে এসেছে এইভাবে— "কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না ৷" (সূরা নাজম: ৩৮; সূরা যুমার: ০৭; সূরা ফাতির: ১৮) সেই দিন বোঝা বহন বলতে কোনো জিনিসপত্র নয়; বরং পাপ-পুণ্যের বোঝা ৷ কারো পাপের ভার কেউ গ্রহণ করবে না এবং কারো পুণ্য কাউকে দিবে না ৷ আর সেখানে হক আদায়ের সিস্টেম হল পুণ্যের বিনিময় ৷ কারো প্রতি কোনো আন্তরিকতা প্রকাশ পাবে না সেই দিন ৷ শুধু নিজ নিজ কর্মপ্রতিফল নিয়ে চিন্তা-দুশ্চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে ৷ কতই না ভয়াবহ হবে সেই দিন!
সেই দিনের ভয়াবহতার কিছু বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “না পিতা পুত্রের কোন উপকারে আসবে এবং না পুত্র পিতার কোন উপকারে লাগবে ৷” (সূরা লুকমান: ৩৩)
তিঁনি আরো বলেন, “সেই দিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতা হতে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তান হতে ৷ সেই দিন তাদের প্রত্যেকের হবে এমন গুরুতর অবস্থা যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে ৷” (সূরা আবাসা, আয়াত: ৩৪-৩৭)
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- হযরত ইকরামা (রা:) বলেছেন যে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীর পিছনে লেগে যাবে ৷ সে আল্লাহ তা'আলার কাছে আরয করবে: “হে আল্লাহ! আপনি তাকে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমার হতে তার দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল?" কাফির মুমিনের পিছনে লেগে যাবে এবং যে ইহসান সে দুনিয়ায় তার উপর করেছিল তা সে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে এবং বলবে: “আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী ৷” মুমিনও তার জন্যে সুপারিশ করবে এবং হতে পারে যে তার শাস্তিও কিছু কম হবে, যদিও জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ অসম্ভব ৷ পিতা পুত্রকে তার প্রতি তার অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবে: “হে আমার প্রিয় বৎস! সরিষা পরিমাণ পুণ্য আজ তুমি আমাকে দাও ৷" পুত্র বলবে: “আব্বা! আপনি জিনিস তো অল্পই চাচ্ছেন ৷ কিন্তু যে ভয়ে আপনি ভীত রয়েছেন সেই ভয়ে আমিও ভীত রয়েছি ৷ সুতরাং, আজ তো আমি আপনাকে কিছুই দিতে পারছি না ৷” তখন সে তার স্ত্রীর কাছে যাবে এবং বলবে: “দুনিয়ায় আমি তোমার প্রতি যে সদ্ব্যবহার করেছিলাম তা তো অজানা নেই?” উত্তরে স্ত্রী বলবে: “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন ৷ কিন্তু এখন আপনার কথা কি?” সে বলবে: “আজ আমি তোমার মুখাপেক্ষী ৷ আমাকে একটি নেকী দিয়ে দাও যাতে আমি আজ এই কঠিন আযাব হতে মুক্তি পেতে পারি ৷” স্ত্রী জবাবে বলবে: “আপনার আবেদন ও চাহিদা তো খুবই হালকা বটে, কিন্তু যে ভয়ে আপনি রয়েছেন সে ভয় আমারও কোন অংশে কম নয় ৷ সুতরাং, আজ তো আমি আপনার কোন উপকার করতে পারব না ৷” (আল-হাদিস)
কেমন হবে সেই মুহূর্তটা যখন সবচেয়ে প্রিয়জন পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নিবে; এমনকি দেখলে পরিচয় না দিয়ে পলায়ন করবে ! কিয়ামতের দিন কেউ তার বোঝা অন্যের উপর চাপাতে চাইলে তা পূর্ণ হবে না ৷ এমন কেউ সেখানে থাকবে না যে তার বোঝা বহন করবে ৷ বন্ধু-বান্ধব ও নিকটতম আত্মীয়রা সবাই সেই দিন মুখ ফিরিয়ে নিবে ৷ অতএব, সেই দিনের একমাত্র সঙ্গী হতে পারে নিজেদের সৎ আমলগুলো ৷ আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত হলে সেই দিনের দুশ্চিন্তা আর জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি মিলবে ৷ তাই, প্রকৃত বুদ্ধিমানগণ কখনো দুনিয়ার ভালোবাসায় ডুবে না গিয়ে পরকালের সামান যোগানোর ভালোবাসায় বেশি ডুবে থাকে ৷ আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের সবাইকে সৎ আমল করার তৌফিক দান করুন ৷ আমিন!
লেখক: আবদুর রশীদ
Comments
Post a Comment