মহান আল্লাহ তা'য়ালার অগণিত সৃষ্টির বৈচিত্র্যের মাঝে রয়েছে ভাষার বৈচিত্রতা ৷ ভাষা মহান আল্লাহ তা'য়ালার শ্রেষ্ঠ দান ৷ মানুষ তার চাহিদা, আবেগ অনুভূতি সবকিছু কেবল ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশ করে থাকে ৷ সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণীর মাঝে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন ভাষা এবং বোঝার ক্ষমতা ৷ জাত ভিত্তিক প্রতিটি প্রাণী নিজেদের ভাষার মাধ্যমে আচরণ প্রকাশ করতে সক্ষম হয় ৷ মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, 'আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য । এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে ।' (সূরা-৩০ রুম, আয়াত: ২১-২২)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা ভাষার গুরুত্ব বোঝাতে অনেক নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন ৷ তাছাড়া ভাষা প্রকাশে অপারগদের প্রতি নজর দিলে তা স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় ৷ পবিত্র কোরআনে এর গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে মর্যাদার সাথে ৷ মহান আল্লাহ তা'য়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন নিজ নিজ গোত্রের মাঝে নিজ নিজ ভাষার উপর ভিত্তি করে যেন দ্বিনের বাণী মানুষেরা বোঝতে পারে ৷ মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য ।' (সূরা-১৪ ইবরাহিম, আয়াত: ৪)
আল্লাহ তা'য়ালা হযরত মূসা(আ.)-কে নবী হিসেবে মনোনিত করেছিলেন ৷ আর মূসা(আ.)-এর ছিল জিহ্বার জড়তা যার কারণে মানুষ তাঁর কথা সঠিকভাবে বুঝতে সমস্যা হবে বিদায় তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কর্ম সহজ করে দিন । আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে ।' (সূরা ত্বহা, আয়াত: ২৫-৩৬)
এর দ্বারা বোঝতে আর বাকি থাকে না যে, ভাষার কত গুরুত্ব রয়েছে ৷ ভাষার মাঝে রয়েছে মাতৃভাষার আলাদা গুরুত্ব, ভালোবাসা ও অনন্য অনুভূতি ৷ এটি দ্বিধাহীন মনের কথা প্রকাশের অনন্য উপায় ৷ নিজ মাতৃভাষা সম্পর্কে গর্ব করে মহানবী (সা.) বলতেন, ‘আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুললিত । তোমাদের চেয়েও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুললিত ৷ কারণ আরবের সবচেয়ে মার্জিত ভাষার অধিকারী সাদিয়া গোত্রে আমি মানুষ হয়েছি । তাঁদেরই কোলে আমার মুখ ফুটেছে । তাই আমি সর্বাধিক সুললিত ভাষা আত্মস্থ করেছি ।’ (আল-মুজাম, হাদিস: ২৩৪৫; আল-বদরুল মুনির ফি তাখরিজিল আহাদিস: খ. ৮, পৃ. ২৮১)
১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার জন্য তরুণদের বিসর্জন দিতে হয়েছিল দেহের তাজা রক্ত ৷ পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই একমাত্র ইতিহাস হয়ে রয়েছে ৷ নিজ ভাষাকে কে না ভালোবাসে, কে না চাই তার ভাষাকে নিয়ে গর্ব করতে ৷ মাতৃভাষার মাধ্যমে নিজেদের অবেগ-অনুভূতি এবং চাহিদাগুলো দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করে থাকি ৷ এই মাতৃভাষাকে ভালোবাসাও রাসূল(স.)-এর সুন্নাত ৷ কিন্তু, মাতৃভাষা বাংলার জন্য যে উৎসর্গ করা হয়েছিল তার উদ্দেশ্য ও ভালোবাসা দিনদিন যেন ব্যাহত হচ্ছে ৷ হারিয়ে যাচ্ছে নিজ ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও নিজ ভাষার চর্চা ৷ পর ভাষার উপর যেভাবে পারদর্শিতা ও দক্ষতার ডিগ্রী নেওয়া হয় গুরুত্বের সাথে, তা মোটেও নেওয়া হয় না মাতৃভাষার উপর ৷ ফলে দিনদিন সংযুক্ত হচ্ছে বাংলা ভাষার মাঝে বিদেশী ভাষার শব্দমালা ৷ এর ফলে ভাষার অনন্য হারিয়ে সৌন্দর্যহানি হয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত ৷ এমনকি অনেকে তো মাতৃভাষাকে নিজ গায়ে ভাষায় বলতেও সংকোচ বোধ করে ৷ অথচ মাতৃভাষা আয়ত্বের প্রথম ধাপটা পার করতে হয়েছে গায়ে ভাষা অর্জনের মধ্য দিয়ে ৷ আর বাংলা ভাষার মধ্যে বৈচিত্র্য হল জেলা ও অঞ্চল ভিত্তিক ভাষার ভিন্নতা ৷ এটাও কেবল রবের দেওয়া বৈচিত্র্য ৷ অতএব, মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে অপর ভাষাকে শ্রদ্ধা করা একান্ত অপরিহার্য ৷ কেননা প্রতিটি ভাষা কেবল মহান আল্লাহ তা'য়ালা দান করেছেন ৷ এতে কারো ভুল ধরা, ব্যঙ্গ করা ও ঠাট্টা করা কখনো সমীচীন নয় এবং তা মারাত্নক অপরাধ ৷ আল্লাহ বলেন, ‘করুণাময় আল্লাহ! তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন, সৃষ্টি করেছেন মানবপ্রাণ । তাকে শিখিয়েছেন ভাষা-বয়ান ।’ (সুরা আর-রাহমান : ১-৪)
আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের সকলকে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার এবং সঠিকভাবে এর মর্যাদা উপলব্ধি করার তৌফিক দান করুন ৷ আমিন!
লেখক: আবদুর রশীদ
Comments
Post a Comment