ইমাম ও খতিবের প্রতি আন্তরিক অনুরোধ

 ইমাম ও খতিবের প্রতি আন্তরিক অনুরোধ:




প্রিয় দ্বীনি ভাই ও শ্রদ্ধেয় গুরুজন, আপনারা যারা বিভিন্ন মসজিদে ইমাম ও খতিবের দ্বায়িত্বে নিয়োজিত আছেন ৷ আপনারা হলেন জাতির মুকুট, আলোর দিশারী এবং পথ হারা পথিকের আশা-ভরসা ৷ রবের পক্ষ থেকে আপনাদের দান করা উপকারি জ্ঞান মানুষের কল্যাণে সর্বদা নিবেদিত ৷ জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে দিশেহারা জাতিকে ফিরিয়ে আনার নব পদ্ধতি সম্পর্কে কেবল আপনারাই বেশি জ্ঞাত ৷ কিন্তু, অদ্য চলাকালিন পথে যেন আপনারা অবহেলায় নিযুক্ত ৷ দেখে বুঝা যায় না যে, আপনাদের মাঝে তেমন আন্তরিকতা বিরাজ করে ৷ দ্বীনের ভুমিকায় যেন সবচেয়ে বেশি পেছনে পড়ে যাচ্ছেন ৷ মনে হয় যেন, জ্ঞানের শূন্যতায় ভুগছেন ৷ এমনটা কিসের কারণ হতে পারে?! নাকি দ্বীন পালনে কোনো কিছুর ভয় করেন আল্লাহ ব্যতীত?!

জুমা'আর দিন সাধারণত ঘন্টা খানিক দ্বীনের আলোচনা হয়ে থাকে ৷ সকলের কর্মকাণ্ড এই দিনে স্থগিত থাকায় একসাথে সবার উপস্থিতির ছাপ পড়ে প্রতিটি মসজিদে ৷ সবাই আগ্রহ নিয়ে শ্রবণ করার অভিপ্রায়ে মনোযোগ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি বুঝারও চেষ্টা করে ৷ তাই, আপনাদের আলোচনা হতে হবে অত্যন্ত ফলপ্রসু ৷
যে আলোচনা কারো উপকারে আসে না কিংবা কারো পরিবর্তনের সূচনা না হয়, তাহলে এর কোনো মূল্য নেই ৷ আপনাদের বক্তব্য হতে হবে অত্যন্ত ইফেক্টিভ ৷ আলোচনা চলমান সময়ে সবার মনমানসিকতা আপনাদের দিকেই ফিরিয়ে রাখার দায়িত্বও কিন্তু আপনাদেরই ৷ এটা শুধু আপনাদের দক্ষতা ও জ্ঞানের ওপর নির্ভর করবে ৷

সাধারণত দেখা যায়, সম্মানিত ইমাম ও খতিবগণের আলোচনা একটি সংকীর্ণ গণ্ডিতেই নির্ধারিত ৷ আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকে কেবল দু'চারটা বিষয়ের উপর ৷ পবিত্র কুরআনে ৬ হাজারের উপর আয়াত রয়েছে ৷ বছরের পর বছর পার হয়ে যায় কিন্তু ইমাম ও খতিবের আলোচনা শুধু কুরআনের ১০% আয়াতগুলোর মধ্যেই হাবু-ডুবু খায় ৷ বাকি আয়াতগুলো কি আলোচনার দাবিদার নয়? রমজান মাস আসলে শুধু এর ফজিলত নিয়ে পুরো মাস পড়ে থাকে, যাকাতের সময় হলে যাকাতের বর্ণনা, কুরবানীর সময় আসলে কুরবানীর মাসয়ালা-মাসায়েল, লায়লাতুল কদর ও নিসফু মিন শাবানের ফজিলত নিয়ে সময় পার হয়ে যায় ৷ কেন? এভাবে চলতে থাকলে কুরআনের সঠিক হক আদায় হবে কি?

আপনাদের সিডিউল এবং দাওয়াহর সেক্টর পরিবর্তন করতে হবে ৷ আপনাদের মাইন্ড বিস্তৃতি লাভ করেনি ৷ আপনাদের চিন্তাশক্তির প্রখরতাকে সংকীর্ণতার জালে বন্ধি করে রেখেছেন ৷ সত্যের আলো পোঁছানোর পথের কাঁটার মুকাবেলার ভয়ে নিস্তব্ধতার মুখোশ পড়ে রয়েছেন ৷ এমনটা হলে তো ইমামের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবেন ৷ ইমাম হলো নেতা ৷ আর নেতার থাকতে হবে দক্ষতা এবং সাহস ৷

প্রতিটি জুমায় ধারাবাহিক একটা করে আয়াতের বিস্তারিত তাফসীর করে যান ৷ সাহাবীদের ঈমানী দ্বীপ্ত জীবনী নিয়ে আলোচনার পর্ব ধারাবাহিকভাবে শুরু করে দেন ৷ প্রথমে আবু বকর(রা:)-এর জীবনীর ওপর, পরে ওমর(রা:)-এর জীবনীর ওপর ইত্যাদি এইভাবে কিছু সাহাবীদের জীবনীর ওপর ইতি টানুন ৷ জিহাদের ওপর সিরিজ আকারে বর্ণনা করুন, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অবক্ষয় ও অনৈতিকতার ওপর কুরআন ও হাদিসের আলোকে যৌক্তিক আলোচনা পেশ করুন, ঈমানের ওপর ঈমানের শাখা-প্রশাখা নিয়ে অধ্যায় আকারে বিস্তারিত ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যান ৷ পরিস্থিতি কি শিক্ষা বহন করে চলছে সেটার ওপর কথা বলার সাহস ও দক্ষতা অর্জন করুন ৷ মাদকতা, নারী নির্যাতন, কুসংস্কার, হত্যাকাণ্ড, ব্যভিচার ও নৈতিকতার ওপর কথা বলুন ৷ কিভাবে শিশুদের গড়ে তুলতে হয়, পিতামাতার দায়িত্ব কি এবং পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কি তা বাস্তবতার ওপর মিলিয়ে কুরআন ও হাদিস ভিত্তিক বুঝিয়ে বলুন ৷ ইসলামে নিষিদ্ধ কর্মগুলোর ওপর বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরুন ৷ সমাজের খারাপ রীতিনীতি, কুসংস্কার ও বিদ'আতের সব পর্দা উন্মোচন করে দিন ৷ সামনের পরিস্থিতি কেমন হতে চলছে সে সম্পর্কে সতর্ক করুন ৷

সুতরাং, কোনো বিষয়ের ওপর পর্ব আকারে আলোচনা চলাকালিন ইসলামী কোনো উৎসব উপস্থিত হলে প্রথমে সেটার ওপর মৌলিক কিছু আলোচনা শেষ করুন এবং পুনরায় পূর্বের টপিকের ওপর একই ধারাবাহিকতায় চলতে থাকুন ৷ সাধারণ মানুষেরা যদি কুরআনের কথাগুলো আপনাদের কাছ থেকে শুনতে না পারে, তাহলে এই মানুষগুলো কুরআন কিভাবে বুঝবে, কিভাবে কুরআনের সৌন্দর্য ও অলৌকিকত্ব দেখবে, এবং কিভাবে কুরআনের আইনগুলো মেনে চলবে??? কুরআনের আলোচনা যদি কেবল দু'একটা বিষয়ের ওপর সীমাবদ্ধ করে রাখেন, তাহলে জাতির চিন্তাশক্তি, বিবেক-বুদ্ধিও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে ৷ ফলে তাদের মাথায় এমন একটা খেলা চলতে থাকবে যে, তাদের মনে হবে এই দু'একটা বিষয় ছাড়া হয়তো কুরআনে আর তেমন বেশি কিছু নেই !!! এতে তারা আরো বেশি সংকীর্ণতাই ভুগবে, হতাশা ও নিরাশার জ্বলে ভেসে বেড়াবে ৷

অতএব, আপনারা জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবেন না ৷ তাদেরকে আলোর দিকে ফিরে আনার চেষ্টা করুন ৷ অতঃপর সর্বদা সত্য বলার চেষ্টা করুন ৷ কুরআনের কোনো বিষয়কে গোপন করার সাহস করবেন না ৷ সবার মাঝে সত্যকে ছড়িয়ে দিন ৷ এতে বাধার সম্মুখীন হতে পারেন, বিপদের কালো মেঘ মাথার ওপর ঘনিয়ে আসতে পারে, হাজার প্রতিবন্ধকতার বেড়াজালে আটকে যেতে পারেন ৷ কিন্তু, ধৈর্য হারাবেন না, হাল ছাড়বেন না, আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছুত হবেন না, ভয় পাবেন না কাউকে ৷ কেউ ভয় দেখাবার যোগ্যতাও রাখে না কেবল মহান আল্লাহ ব্যতিত ৷ কেননা তিনিই তো শাস্তি ও প্রসান্তির জন্য জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন ৷ মানুষ শুধু শারীরিক আঘাতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মৃত্যু ঘটাতে পারে এর বেশি না ৷ তাতো খুবই ক্ষণিক ৷ কিন্তু মনে রাখবেন, আল্লাহর আদালতে শাস্তির কোনো শেষ প্রান্ত নেই ৷

আপনাদের যদি কুরআনের সত্য কথাগুলো বলতে ও সবার মাঝে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার যোগ্যতা না থাকে, তাহলে আপনাদের উচিত হবে ইমামের স্থান থেকে সরে দাঁড়ানো ৷ কারণ যোগ্য স্থানে অযোগ্যরা দখলে নিলে শীঘ্রই ইসলামের অবনতি শুরু হয়ে যাবে ৷ যোগ্যদের হক্ব মেরে খাবেন না ৷ যারা বলতে পারে তাদের জন্য সেই স্থান ছেড়ে দিন ৷ লোভে অন্ধ হয়ে হক্ব কথা না বলে ইসলামের শত্রুদের সাথে তাল মিলিয়ে চলবেন না ৷

আল্লাহ তা'য়ালা সকল ইমাম ও খতিবদের বুঝার তৌফিক দান করুক ও তাদের হেফাজত করুক এবং তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও সাহস বাড়িয়ে দিক ৷ সঠিকভাবে কুরআনের হক্ব আদায় করার তৌফিক দান করুক ৷ আমিন ৷৷

লেখক: আবদুর রশীদ

Comments