তাকওয়ার পরীক্ষা এবং নিয়তের বিশুদ্ধতায় কুরবানির তাৎপর্য


"তাকওয়ার পরীক্ষা এবং নিয়তের বিশুদ্ধতায় কুরবানির তাৎপর্য"



কুরবানি হল ইসলামের বিধানের একটি অন্যতম অংশ ৷ এই বিধান হল তাকওয়ার পরীক্ষা যা হজরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকে বিদ্যমান ৷ প্রত্যেক নবী-রাসূলদের ওপর ভিন্ন ভিন্ন কুরবানির বিধান ছিল ৷ সেই ধারাবাহিকতায় হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর তাকওয়ার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত চুড়ান্ত একটি নিয়ম অনুসরণীয় করা হয়েছে ৷ মূলত কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের সার্টিফিকেট দাখিল করা হয় এবং তাঁর অনুগত বান্দা হিসেবে স্বীকৃতি হাছিল হয় ৷

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যে সমস্ত জন্তু তিনি রিজ্ক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ কর; আর অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও ৷’ (সূরা, হজ্ব- ৪)।আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া ৷'(সূরা,হজ্ব-৩৭)

আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের অর্থ হল তাঁর হুকুম পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করা ৷ সুতরাং, মালিকের আনুগত্য প্রকাশ পায় তাঁর হুকুম পালনের মাধ্যমে ৷ তাই, মহান আল্লাহ তা’য়ালা হজরত ইবরাহিম(আ.)-কে পরীক্ষা করতে চেয়েছেন যে, তিনি আল্লাহর অনুগত বান্দা কিনা ৷ অতএব, তিনি হজরত ইবরাহিম(আ.)-কে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখালেন যে, তিনি তাঁর প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাঈল(আ.)-কে কুরবানি দিচ্ছেন ৷ হজরত ইবরাহিম(আ.) প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাঈল(আ.)-কে স্বপ্নটি খুলে বলাতে ইসমাঈল(আ.) পিতাকে বললেন, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা পালন করুন ৷ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের কাতারে পাবেন ৷ সুতরাং, হজরত ইবরাহিম(আ.) তাঁর প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাঈল(আ.)-কে কুরবানি করতে আরম্ভ হলেন ৷ অতঃপর ইবরাহিম(আ.) আল্লাহর পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন ৷ তাই, আল্লাহ তা’য়ালা এমতাবস্থায় ওহির মাধ্যমে ইসমাঈল(আ.)-এর পরিবর্তে জন্তুর ওপর কুরবানি ওয়াজিব করে দেন ৷

এই ঘটনায় আমাদের জন্য একটা দারুণ শিক্ষা নিহীত রয়েছে ৷ চিন্তা করুন, যদি ইসমাঈল(আ.)-কে সেদিন জন্তুর পরিবর্তে তাঁকে কুরবানি করা হত, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক পিতার ওপর তাঁর প্রিয় সন্তানকে কুরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যেত ৷ সুবহান’আল্লাহ ! আল্লাহ তা’য়ালা কতই না দয়াময় এবং কতই না ভালবাসেন তাঁর বান্দাগণকে তা এই ঘটনায় প্রমাণ করে ৷ আমাদের প্রিয় সন্তানদের কুরবান করাটা আমাদের কাছে কতই না কঠিন হত তা বুঝতে পারাও অনেক কঠিন ৷ 

এই দিক থেকে বিবেচনা করে আমাদের অবশ্যই সবচেয়ে উত্তম, সুন্দর ও সুঠাম দেহি জন্তু আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি করা উচিত ৷ অথচ মানুষ এরপরও রবের শুকরিয়া আদায় করে না ৷ লোক দেখানো ও গোশত খাওয়ার জন্য কুরবানি করে; এমনকি অধিকাংশেরই নিয়ত অপরিষ্কার থাকে ৷ মনে রাখে না যে, এই কুরবানি হল নিজেদের তাকওয়ার পরীক্ষা ৷ 

কুরবানি বিশুদ্ধ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হল নিয়তের বিশুদ্ধতা ৷ প্রতিটি ইবাদতের মূল শর্ত থাকে নিয়ত ৷ হাদিসে এসেছে- উমার(র.:) বলেন, “আমি রাসূল(সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, যাবতীয় কার্য নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তাই প্রাপ্য হবে, যার সে নিয়ত করবে ৷ (বুখারি হাদীস নং ১, ৫৪, ২৫২৯, ৩৮৯৮, ৫০৭০, ৬৬৮৯, ৬৯৫৩, মুসলিম ১৯০৭, তিরমিযি ১৬৪৭, নাসায়ি ৭৫, ৩৪৩৭, ৩৭৯৪, আবু দাউদ ২২০১, ইবন মাজাহ ৪২২৭, আহমদ ১৬৯, ৩০২) । 

যে কোনো ইবাদতে যদি নিয়তের মধ্যে সমস্যা থাকে, তাহলে ওই ইবাদত গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রেও সমস্যা হবে ৷ তাই, প্রত্যেক ইবাদতে নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া চাই ৷ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার বাহ্যিকতা দেখেন না; বরং বান্দার অন্তরের বিশুদ্ধতা দেখেন ৷ তাই, বাহ্যিকভাবে বান্দা যতই ভালো কিছু প্রকাশ করুক, এর কোনো মূল্য নেই ৷ কুরবানি না করলে লোকেরা কি বলবে তা ভেবে কুরবানি করা এবং বাহ বাহ পাওয়ার জন্য বড় জন্তু দ্বারা কুরবানি করা ইত্যাদি বিশুদ্ধ নিয়তের পরিপন্থি; এমনকি কপটতার দরুণ ভাল জন্তুর পরিবর্তে অনেকটাই দুর্বল প্রকৃতির জন্তু দ্বারা কুরবানি করাও এক প্রকার নিয়তের দুর্বলতার বহি:প্রকাশ ৷ সুতরাং, কুরবানির জন্তু খাওয়াকে লক্ষ্য না বানিয়ে নিজেদের তাকওয়া প্রকাশকে লক্ষ্য বানানো একান্ত অপরিহার্য ৷

আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেকের নিয়তকে বিশুদ্ধ করার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কুরবানি করার তৌফিক দান করুক ৷ আমিন!

কুরবানি সম্পর্কিত মৌলিক তথ্যসূত্র: (সূরা হজ্ব: ২৭-৩৭; সূরা বাকারাহ: ১৯৬; সূরা মায়েদা: ২, ২৭-৩১, ৯৫-৯৭; সূরা ফাতহ: ২৫; সূরা আন'আম: ১৬১-১৬৩; সূরা কাউসার: ২

লেখক: আবদুর রশীদ

Comments