দ্বীনের ভুমিকায় কতটুকু অবদান রাখছে 'মিয়া খলিলুর রহমান জামে মসজিদ'

 


দ্বীনের ভুমিকায় কতটুকু অবদান রাখছে 'মিয়া খলিলুর রহমান জামে মসজিদ'

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রাণকেন্দ্র হলো মসজিদ ৷ প্রাসাদে বাস করা ধনী এবং ফুটপাতে পড়ে থাকা গরীবের মধ্যকার পার্থক্যের নেই কোনো প্রাচীর ৷ এতে ধনী-গরিব, বড়ো-ছোটো বলতে কোনো ভেদাভেদ নেই; সবাই একই কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজে দাঁড়ানোর মাধ্যমে সবার মধ্যে ভালোবাসা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় ৷ এটা দৈনিক পাঁচবার মুসলিম উম্মাহর মিলন মেলার প্রতিষ্ঠান ৷ এটা শুধু উপাসনাগৃহ নয়; বরং যাপিত জীবনের সকল সমস্যা সমাধানের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ৷ মনোমুগ্ধকর দ্যুতি ছড়ানো দৃষ্টিনন্দন সব মসজিদগুলো ইসলামের এক অসাধারণ প্রতীক ৷ প্রতিটি মসজিদই আধুনিক স্থাপত্যের ইসলামী প্রতীক হয়ে আছে ৷ এসব মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেছনে আছে গৌরবময় ইতিহাস ৷ সেই ঐতিহ্যের একটি প্রতিকীর সাক্ষাতে নিস্তব্ধ কলমের পদচারণা ৷

চট্টগ্রাম, সাতকানিয়া উপজেলার অন্তর্গত ১১নং কালিয়াইশ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে আরকান সড়ক সংলগ্ন পশ্চিম পাশে, মৌলভীর দোকানের নিকটস্থ বিশাল এরিয়া নিয়ে গঠিত এই সুদৃশ্য মসজিদ ৷ বলা হয়ে থাকে দক্ষিণ চট্টগ্রামে এমন বিশাল স্থান নিয়ে কোনো মসজিদ গড়ে উঠেনি ৷ তবে, কারুকার্যখচিত নৈপুণ্যে ভরা হাজার মসজিদের উপস্থিতি বিরাজমান ৷ যাইহোক, মসজিদটির নাম মিয়া খলিলুর হমান জামে মসজিদ এবং তা আনুমানিক ১৮০৫ ইং সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ৷ তবে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৮ ইং সালে প্রায় ৮ কানি জমির ওপর ৷ মসজিদটি জায়গার মধ্যবিন্দুতে অবস্থিত ৷ এর উত্তরে রয়েছে কবরস্থান এবং তার পাশে রয়েছে ঈদগাহ ময়দান ৷ দক্ষিণে রয়েছে আরো একটি কবরস্থান এবং পশ্চিম পাশে প্রায় ২.৫ (আড়াই) কানি পরিমাণ জায়গা নিয়ে গঠিত বিশাল পুকুর যেখানে অযু ও গোসলের ব্যবস্থা বিদ্যমান ৷ মসজিদের সামনে(পূর্ব পাশ) রয়েছে বৃহদাকার মাঠ যেখানে পার্কিং-এর সুব্যবস্থা উপস্থিতির পাশাপাশি রয়েছে অযুখানা এবং রাস্তার দ্বারে রয়েছে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সুব্যবস্থা ৷ মসজিদটি ৩ তলা সম্পন্ন হওয়ার প্রায় শেষের দিকে ৷ এই মসজিদে একসাথে ১৫০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে ৷

আমরা এই মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে থাকি ৷ ফলে আমাদের ভালোবাসা অনেকটাই এর সাথে জড়িত ৷ যে কারণে মসজিদটি সবচেয়ে বেশি প্রশংসাযোগ্য তা হলো— সুনানে আবু দাউদ ৪৪৮ নং হাদিস থেকে জানতে পারি যে, মসজিদসমূহ জাঁকজমকপূর্ণ করা নিষিদ্ধ ৷ হাদিসটির আলোকে এই মসজিদটির ভেতর-বাহির জাঁকজমক পূর্ণতার দিক থেকে অনেকটাই কম যা বলতে গেলে সাধারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় ৷ সহিহ বুখারি ৩৪৫৩ নং হাদিস থেকে জানতে পারি যে, মসজিদ কবরকেন্দ্রিক হওয়া নিষিদ্ধ ৷ সুতরাং এদিক থেকেও মসজিদটি পবিত্র ৷ পার্কিং-এর সুব্যবস্থা, ঈদের নামাজ ও জানাযার নামাজের সুব্যবস্থা দারুন ৷ মসজিদের ভেতরে অনেকটা শীতল পরিবেশ বিরাজ করে ৷ এসি বিহীন প্রচণ্ড গরমের সময়ও তেমন উত্তপ্ত পরিলক্ষিত হয় না ৷ ৪-৫ টা গ্রাম জড়িত থাকায় এই মসাজিদে জুমার নামাযে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আগমন করে থাকে ৷ এছাড়াও মসজিদটি অনেক উল্লেখযোগ্য কারণে প্রশংসাযোগ্য ৷

তবে, মসজিদটি দ্বীনের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ ভুমিকা রাখতে এবং তার যে অভাবগুলো এখনো পূরণ করতে সক্ষম হয়নি তা হলো— সুবৃহৎ এই মসজিদে মহিলাদের জন্য আলাদা কোনো অযু ও নামাজের সুব্যবস্থা নেই ৷ ফলে গাড়ি থেকে নেমে পড়া ভদ্র মহিলাগণ নামাজে বিব্রত অবস্থায় পড়ে যায় যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ৷ ইসলামে নারীদের পর্দার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন ৷ মসজিদের ভেতর বিশুদ্ধ পানি পান করার কোনো সুব্যবস্থাও নেই; যেটুকু রয়েছে অনেকটাই বেকার হিসেবে ধরা যেতে পারে ৷ যেহেতু আমরা এই মসজিদে নিয়মিত নামাজে উপস্থিত থাকি, তাই আমরা দেখতে পায় মসজিদের ভেতর অংশ প্রায়ই অপরিষ্কার থাকে ৷ ফলে নামাজে দৃষ্টিলব্ধ হয় যে, অনেকে সিজদাহ করতে গেলে প্রথমে ফুঁক দেই এবং পরে সিজদাহ করে ৷ এটা নামাজের একটা অনুচিত কাজ ৷ এমনটা ঘটার কারণ দায়িত্বরত ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমের আন্তরিক তৎপরতার অভাব ৷ বিশাল এই মসজিদে খাদেমের প্রয়োজন ৩-৪ জন, যদিও বর্তমান খাদেম রয়েছে কেবল ১ জন ৷ পবিত্র কুরআন রাখার ব্যবস্থা থাকলেও তাতে শুধু অনুবাদ ও তাফসীর বিহীন কুরআন বিদ্যমান; এমনকি মসজিদ কর্তৃক কোনো লাইব্রেরি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করা হয় নি ৷ টয়েলেটের ভালো ব্যবস্থা থাকলেও মহিলাদের জন্য আলাদা কোনো সুব্যবস্থা নেই ৷

এছাড়াও মসজিদটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও ২৪ ঘন্টা খোলা রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই ৷ উচিত হলো মসজিদ সবসময়ের জন্য খোলা রাখা এবং সিকিউরিটি গার্ড নিশ্চিত করা ৷ নিয়মিত মুসল্লির জুতা চুরি সহ অনেক সময় বাইক পর্যন্ত চুরির ঘটনা ঘটে থাকে ৷ এর সুরক্ষা নিশ্চিত করার অভিপ্রায়ে কোনো সিসি ফোটেস সহ অন্যান্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা এখনো অনিশ্চিত হয়ে রয়েছে ৷ এমনকি মসজিদটি সরকারিভুক্ত রেজিট্রি না হওয়ায় গুগলে এর কোনো উইকিপিডিয়া নেই ৷ একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বিজ্ঞ আলেম ও ধার্মিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে ৷ কিন্তু মসজিদটি পরিচালনায় একজন আলেম থাকলেও সুশিক্ষিত ধার্মিক কোনো ব্যক্তি পরিচালনার কাজে নিয়োজিত নয় ৷ যদিও এলাকায় সৎ ব্যক্তি ও আলেমের কোনো অভাব নেই, এরপরও এমনটাই পরিস্থিতি সাক্ষ্য বহন করে চলছে ৷ ইসলামের বাণী সবার মাঝে পৌঁছে দিতে মসজিদ কর্তৃক কোনো কর্মসূচিও নেই ৷ দ্বীনের ভুমিকায় খুব সামান্নই অবদান রাখছে ৷

ইসলামের আলো সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অন্যায়-অনাচার, সুদ-ঘুষ, যৌতুক প্রথা ও কুসংস্কার নির্মূল করার জন্য মসজিদ কর্তৃক কর্মসূচি থাকা অত্যন্ত অপরিহার্য ৷ কেননা মসজিদ হলো মুসলিম উম্মাহর ব্যক্তিজীবন হতে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ৷ তাই, এখান থেকেই সমাজ, রাষ্ট্রীয় সম্পর্কিত সবধরনের আলোচনা উত্থাপিত হবে ৷ এটাকে শুধু উপাসনালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা নিন্দনীয় ৷ রাসূল (স:) সবকিছু মসজিদে নববি থেকেই সুরাহ করতেন ৷

বিশাল এরিয়া নিয়ে গঠিত এই মসজিদে কিছু দারুন কর্মসূচি থাকা অতিব প্রয়োজন মনে করি ৷ উদাহরণস্বরূপ— ১. মসজিদ কর্তৃক দাওয়াহ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেখান থেকে হতাশাগ্রস্ত তরুণ ও যুবকদের সঠিক পথে আহ্বান করার মাধ্যমে যেন দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানো যায় ৷ ২. মসজিদে রমজানে একসঙ্গে ইফতার করার আয়োজন করা যেন পরস্পরের মধ্যে সৌহর্দ্য গড়ে উঠে ৷ ৩. মসজিদ কর্তৃক কর্যে হাসানা ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা যাতে সুদের জালে আটকে পড়া দরিদ্র্য ব্যক্তিগণ বিনা সুদে ঋণ পেয়ে যেন সুদের হাত থেকে মুক্তি পায় ৷ ৪. পাঠাগার নিশ্চিত করা যেন অবসর সময়কে তরুণরা বইয়ের মধ্যে বিনোদন খোঁজতে পারে এবং ইসলামকে যেন আরো ভালোভাবে জানতে পারে ৷ ৫. মসজিদকেন্দ্রিক ধারাবাহিক মাসিক তাফসীর পোগ্রামের ব্যবস্থা করা ৷ ৬. মসজিদ কর্তৃক পরিচ্ছন্নতা অভিযান, শীতবস্ত্র বিতরণ ইত্যাদির আয়োজনও করা যেতে পারে ৷ ৭. শিশুদের মসজিদের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানোর বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করা ৷ (ম্যাসেজ)

প্রতিটি ছোট-বড় মসজিদ কর্তৃক দ্বীনের খেদমতে কম বেশি কর্মসূচি থাকা একান্ত অপরিহার্য ৷ সুতরাং মসজিদগুলো হোক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সকল সমস্যা সমাধানের প্রাণকেন্দ্র ৷ প্রতিটি ঈমাম ও খতিবের উচিত সামাজিক, রাষ্ট্রীয় অবক্ষয় ও অনৈতিকতার বিষয়গুলো মুসল্লিদের সামনে পেশ করা এবং প্রতিটি সমস্যা সমাধানকল্পে কোন কোন বিষয়ের প্রতি সিরিয়াস হতে হবে সেগুলো উপাস্থাপন করা ৷ ঈমাম ও খতিবগণের উচিত বাস্তবতার খারাপ পরিস্থিতি রোধে নিজেরাই নেতৃত্বের মাধ্যমে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং সুদিনের পরিস্থিতে সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা আরো মজবুত করার অভিপ্রায়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা ৷ মহান আল্লাহ তা'য়ালা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্যতা দান করুক এবং মসজিদকে আমাদের যাবতীয় সমস্যা সমাধানের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়ার তৌফিক দান করুক ৷ আমিন ৷৷

লেখক: আবদুর রশীদ

Comments