নিম্নোক্ত ১৫ টি বিষয়ের উপর আলোকপাতের সমন্বয়ে মহামারি সংক্রান্ত বিস্তারিত ধারণা মিলবে ইনশা'আল্লাহ ৷
বিষয়সূচি:
=======
১. মহামারি আসার কারণ:
২. মহামারিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি:
৩. মহামারি নিয়ে রাসূল(স:) এর ভবিষ্যদ্বাণী:
৪. মহামারি দেখা দিলে করণীয়:
৫. মহামারিতে মারা গেলে শাহাদাতের মর্যাদা:
৬. মহামারিতে পড়ার দোয়াসমূহ:
৭. সাহাবাযুগে মহামারি:
৮. মহামারি বিস্তারের অনুকুল অবস্থা ও প্রেক্ষাপট:
৯. তাবেয়িযুগে মহামারি:
১০. মহামারি প্রতিরোধে হজরত ওমর (রা:) এর সিদ্ধান্তই ছিল যুগোপযোগী:
১১. সংক্রমন সংক্রান্ত:
১২. মহামারির সময় বাড়িতে নামাজ আদায় সংক্রান্ত:
১৩. সরকারি নির্দেশনা ও করণীয় :
১৪. প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল:
১৫. মহামারিতে প্রচলিত কুসংস্কার:
(১)
===================================
(মহামারি আসার কারণ:)
মহামারি আসার কারণ সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত:
(*) ظَهَرَ الْفَسَادُ فِى الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِى عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। (সূরা-রূম:৪১)
(*) وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِن قَبْلِكُمْ لَمَّا ظَلَمُوا ۙ وَجَآءَتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنٰتِ وَمَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا ۚ كَذٰلِكَ نَجْزِى الْقَوْمَ الْمُجْرِمِينَ
আর অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, যখন তারা যুলম করেছে। আর তাদের নিকট তাদের রাসূলগণ প্রমাণাদিসহ আগমন করেছিল, কিন্তু তারা ঈমান আনার ছিল না। এভাবে আমি অপরাধী কওমকে শাস্তি প্রদান করি। (সূরা-ইউনুস:১৩)
(*) وَلَقَدْ أَرْسَلْنَآ إِلٰىٓ أُمَمٍ مِّن قَبْلِكَ فَأَخَذْنٰهُم بِالْبَأْسَآءِ وَالضَّرَّآءِ لَعَلَّهُمْ يَتَضَرَّعُونَ
আর আমি তোমাদের পূর্বেকার জাতিসমূহের কাছে বহু রাসূল পাঠিয়েছি, আমি তাদের প্রতি ক্ষুধা, দারিদ্রতা ও রোগ ব্যাধি চাপিয়ে দিয়েছি, যেন তারা নম্রতা প্রকাশ করে আমার সামনে নতি স্বীকার করে। (সূরা-আন'আম:৪২)
(*) وَمَآ أَصٰبَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَن كَثِيرٍ
আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন। (সূরা-আশ-শুরা:৩০)
(*) فَلَوْلَا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِن قَبْلِكُمْ أُولُوا بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِى الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّنْ أَنجَيْنَا مِنْهُمْ ۗ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَآ أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ
অতএব তোমাদের পূর্বের প্রজন্মসমূহের মধ্যে এমন প্রজ্ঞাবান কেন হয়নি, যারা যমীনে ফাসাদ করা থেকে নিষেধ করত? অল্প সংখ্যক ছাড়া, যাদেরকে আমি তাদের মধ্য থেকে নাজাত দিয়েছিলাম। আর যারা যুলম করেছে, তারা বিলাসিতার পেছনে পড়ে ছিল এবং তারা ছিল অপরাধী। (সূরা-হুদ:১১৬)
(*) وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَىْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوٰلِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرٰتِ ۗ وَبَشِّرِ الصّٰبِرِينَ
আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। (সূরা-বাকারাহ:১৫৫)
মহামারি আসার কারণ সম্পর্কিত হাদীস:
‘যখন কোনো কওমের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তা প্রকাশ্যেও করতে শুরু করে তবে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৪০১৯)।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্লেগ রোগ (মহামারি) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। আল্লাহর নবী (সা.) তাঁকে জানান, এটি হচ্ছে এক ধরনের শাস্তি। আল্লাহ যার ওপর তা পাঠাতে ইচ্ছে করেন, পাঠান। কিন্তু আল্লাহ এটিকে মুমিনের জন্য রহমত বানিয়েছেন। অতএব প্লেগ রোগে কোনো বান্দা যদি ধৈর্য ধরে এবং এ বিশ্বাস নিয়ে আপন শহরে অবস্থান করতে থাকে যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না; তাহলে সেই বান্দার জন্য থাকবে শহীদের সাওয়াবের সমান সাওয়াব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৩৪)
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘গোনাহের কারণে মানুষের রিজিক কমে যায়।’ (ইবনে মাজাহ: ৪০২২)
(২)
===================================(মহামারিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি:)
অতীতেও আল্লাহ পাপাচারের শাস্তি হিসেবে মহামারি প্রাদুর্ভাব ঘটান এবং সে জাতিকে ধ্বংস করে দেন। দাউদ (আ.)-এর যুগে এমন ঘটনা ঘটেছিল। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তুমি কি তাদের দেখনি যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি ত্যাগ করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের বলেছিলেন, তোমাদের মৃত্যু হোক। তারপর আল্লাহ তাদের জীবিত করেন। ...’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৪৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তারা সংখ্যায় ছিল চার হাজার। মহামারির ভয়ে তারা পালিয়ে ছিল। তারা বলেছিল, আমরা এমন ভূমিতে যাব যেখানে মৃত্যু নেই। অতঃপর তারা এক স্থানে একত্র হলো। তখন আল্লাহ তাদের ওপর মৃত্যুর ফরমান জারি করেন।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)
এ ছাড়া একটি হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় আল্লাহ অতীতের কোনো কোনো গোত্রকে মহামারির মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছেন। মহামারি প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটি আল্লাহর গজব বা শাস্তি, বনি ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীর ওপর এসেছিল, তার বাকি অংশই হচ্ছে মহামারি। অতএব, কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস : ১০৬৫)
(৩)
===================================
(মহামারি নিয়ে রাসূল(স:) এর ভবিষ্যদ্বাণী:)
এই মহামারি থেকে আল্লাহ পবিত্র নগরী মদিনাকে রক্ষা করবেন বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মদিনায় ঢুকতে পারবে না দাজ্জাল, আর না কোনো মহামারি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৩১)
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের আগের ছয়টি নিদর্শন গণনা করে রাখো। আমার মৃত্যু, অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়, অতঃপর তোমাদের মধ্যে ঘটবে মহামারি, বকরির পালের মহামারির মতো, সম্পদের প্রাচুর্য, এমনকি এক ব্যক্তিকে একশ’ দিনার দেয়ার পরও সে অসন্তুষ্ট থাকবে। অতঃপর এমন এক ফিতনা আসবে, যা আরবের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে। অতঃপর যুদ্ধবিরতির চুক্তি, যা তোমাদের ও বনি আসফার বা রোমকদের মধ্যে সম্পাদিত হবে। অতঃপর তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং ৮০টি পতাকা উড়িয়ে তোমাদের বিপক্ষে আসবে; প্রতিটি পতাকার নিচে থাকবে ১২ হাজার সৈন্য। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১৭৬)
(৪)
===================================(মহামারি দেখা দিলে করণীয়:)
যেকোনো বিপদে বান্দা আল্লাহমুখী হোক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা ও আশ্রয় প্রার্থনা করুক এটাই মহান প্রতিপালক আল্লাহর প্রত্যাশা। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে বিপদে আল্লাহমুখী হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তাই মহামারি দেখা দিলে মুমিনের প্রধান কাজ হলো নিজের ভুল ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে বিনীত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনীত হলো না এবং কাতর প্রার্থনাও করে না।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৭৬)
(*) ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
তোমরা তোমাদের রবকে ডাক অনুনয় বিনয় করে ও চুপিসারে। নিশ্চয় তিনি পছন্দ করেন না সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে। (সূরা-আরাফ:৫৫)
(*) وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِى وَلْيُؤْمِنُوا بِى لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। (সূরা-বাকারাহ:১৮৬)
বেশির ভাগ মহামারিই সংক্রামক। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) মহামারির সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত অঞ্চলে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। মুমিন ঈমান ও ইখলাসের সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা কোথাও মহামারির সংবাদ পাবে তখন সেদিকে যেও না। আর যদি তোমরা মহামারীতে আক্রান্ত ভূমিতে পূর্ব থেকেই অবস্থান করো তাহলে সেখান থেকে পালিয়ো না। (বুখারী: ৫৭৩৯, মুসলিম: ২২১৯)।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় পাওয়া যায় শামে মহামারি দেখা দিলে ওমর (রা.) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফর স্থগিত করেন। (হাদিস : ৫৭২৯)
(৫)
===================================
(মহামারিতে মারা গেলে শাহাদাতের মর্যাদা:)
আল্লাহ তাআলা শাস্তি হিসেবে মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটান। যেন বান্দা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। সুতরাং মহামারি দেখা দিলে কোনো বান্দা যদি আল্লাহর কাছে বিনীত হয়ে তাওবা করে এবং রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ মোতাবেক ধৈর্যের পরীক্ষা দেয়, তবে আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দান করবেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পেটের রোগে মারা গেলে শহীদ, প্লেগে মারা শহীদ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৩৩)
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, পাঁচ প্রকার মৃত শহীদ—মহামারিতে মৃত, পেটের পীড়ায় মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত এবং যে আল্লাহর পথে শহীদ হলো। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮২৯)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, মহামারিতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৩০)
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ জেনে রাখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সূরা ইউনূস : ৬২)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি মহামারিতে পতিত হয় এবং নেকির আশায় সে ধৈর্য্যসহকারে সেখানে অবস্থান করে এবং এ বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ তাআলার হুকুম ব্যতিত কিছুই হয় না, তাহলে সে শহীদের সওয়াব পায়। (বুখারী শরীফ : ৫৪০২)।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে কোনো ব্যক্তি মহামারীর সময় নিজেকে ঘরে রুদ্ধ রাখবে ধৈর্যসহকারে, সওয়াবের আশায় এবং এই বিশ্বাস নিয়ে যে, আল্লাহ তার ভাগ্যে যা লিখেছেন এর বাইরে কিছুই ঘটবে না, সে শহীদের মর্যাদা ও বিনিময় লাভ করবে। (-ফতহুল বারী শরহে বুখারী, ১৯৪/১০)
(৬)
===================================
(মহামারিতে পড়ার দোয়াসমূহ:)
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত দোয়াটি সন্ধ্যায় তিনবার পাঠ করবে সকাল হওয়া পর্যন্ত তার প্রতি কোনো বিপদ হঠাৎ চলে আসবে না। আর যে তা সকালে তিনবার পাঠ করবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ওপর কোনো হঠাৎ বিপদ আসবে না। দোয়াটি হলো,
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
অর্থ : ‘আল্লাহর নামে যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো বস্তুই ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৮৮ & তিরমিজি:৩৩৮৮)
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, (রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য) নবী (সা.) পড়তেন,
> اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَ الْجُنُوْنِ وَ الْجُذَامِ وَمِنْ سَىِّءِ الْاَسْقَامِ
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেত, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সব দুরারোগ্য ব্যাধি হতে।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৫৫৪)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘর থেকে বের হতেন তখন এ দুআ পড়তেন, বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। (আবু দাউদ: ৫০৯৫)।
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন’ দুআটি বেশি বেশি পাঠ করা।
বেশি বেশি দান-সাদকা ও মাতা-পিতার সেবা করা, পরিবারের লোকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। নবী (সা.) বলেন, দান-সাদকা ও সৎ কর্ম অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে।
তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে দুআ করা। নবী সা. বলেন, তাহাজ্জুদের সালাত শরীরের যাবতীয় রোগবালাই দূর করে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং ঘরবাড়ি ও আঙ্গিনা পরিচ্ছন্ন রাখা। যত্রতত্র কফ, থুথু এবং নাকের ময়লা না ফেলা।
অজুঅবস্থায় থাকা। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ। (মুসলিম, হাদিস : ৪২২)
(৭)
===================================
(সাহাবাযুগে মহামারি)
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় বড় মহামারি হয়েছে। মহামারি দেখা দিয়েছিল সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়িদের সোনালি যুগেও। নিম্নে তেমন কিছু ঘটনা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো—
আবদুল্লাাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে উমার (রা.) শামের দিকে রওনা হলেন। ‘সারগ’ পর্যন্ত পৌঁছলে ‘আজনাদ’ অধিবাসীদের (প্রতিনিধি ও অধিনায়ক) আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তখন তাঁরা খবর দিলেন যে শামে মহামারি শুরু হয়ে গেছে ৷ উমার (রা.) লোকদের মাঝে ঘোষণা দিলেন, ‘আমি ফজর পর্যন্ত সওয়ারির ওপর থাকব, তোমরাও (ফজর পর্যন্ত সওয়ারির ওপর) অবস্থান করো।’ তখন আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) বললেন, আল্লাহর তাকদির থেকে পলায়ন করে? তখন উমার (রা.) বললেন, ‘হে আবু উবায়দা! হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর তাকদির থেকে আল্লাহরই তাকদিরের দিকে পলায়ন করছি। তোমার যদি একপাল উট থাকে আর তুমি একটি উপত্যকায় অবতীর্ণ হওয়ার পর দেখো যে দুটি প্রান্তর রয়েছে, যার একটি সবুজ শ্যামল, অপরটি শূন্য। সে ক্ষেত্রে তুমি যদি সবুজ শ্যামল প্রান্তরে (উট) চরাও, তাহলে আল্লাহর তাকদিরেই সেখানে চরাবে, আর যদি তৃৃণশূন্য প্রান্তরে চরাও, তাহলেও আল্লাহর তাকদিরেই সেখানে চরাবে।’ বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় আবদুর রাহমান ইবন আউফ (রা.) এলেন, তিনি (এতক্ষণ) তাঁর কোনো প্রয়োজনে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে (হাদিসের) ইলম রয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা কোনো এলাকায় এর সংবাদ শুনতে পাও তখন তার ওপরে (দুঃসাহস দেখিয়ে) এগিয়ে যেয়ো না। আর যখন কোনো দেশে তোমাদের সেখানে থাকা অবস্থায় দেখা দেয় তখন তা থেকে পলায়ন করে বেরিয়ে পোড়ো না।’ বর্ণনাকারী বলেন, তখন উমার (রা.) আল্লাহর হামদ করলেন। তারপর চলে গেলেন। (মুসলিম, হাদিস : ৫৫৯১)
(৮)
===================================
(মহামারি বিস্তারের অনুকুল অবস্থা ও প্রেক্ষাপট:)
শামে মুসলিম ও রোমান বাহিনীর মধ্যে সংগঠিত যুদ্ধে অসংখ্য রোমান সেনা নিহত হয়। মুসলিম সেনাদের লাশ দাফন করার ব্যবস্থা হলেও রোমানদের লাশ দাফন করা হয়নি। জনমানবহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে অসংখ্য লাশ। একটু একটু করে লাশ পচে-গলে দূষিত হতে থাকে আবহাওয়া আর জলাধার। এতে করেই সেখান থেকে সৃষ্ট নানা জীবাণু বিস্তার লাভ করে এবং মহামারির রূপ ধারণ করে। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের এমন মতামতই তুলে ধরেছেন হাল আমলের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আলী সাল্লাবী ও রাগিব সারজানী। ইবন হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, ‘এটা ছিল শরীরে এক ধরনের ফোসকা ও একটু বড় টিউমারের মতো।’ এই রোগে কেউ আক্রান্ত হলে পাঁচ দিনের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে তখন সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মুসলিম সেনা যুদ্ধ করছিলেন। তাঁদের ৮০ শতাংশ সেই মহামারিতে ইন্তেকাল করে শহীদের মর্যাদা লাভ করে।
আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) ও উমার (রা.)-এর মধ্যে মর্মস্পর্শী পত্র বিনিময়ের কথা আমরা সবাই জানি। অবশেষে মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.)-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) নিজেও এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে সহচরদের এই বলে উপদেশ দিতে দিতে ইন্তেকাল করেন যে ‘হে লোকসকল! এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে রহমত। তোমাদের নবীর দোয়ার প্রতিফল।’
আবু উবায়দা (রা.)-কে দাফন শেষে মুয়াজ (রা.) ভাষণ দিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার! তোমরা সকলেই কায়মনোবাক্যে তওবা করো। কারণ যে বান্দা প্রকৃত তওবা করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এই অবস্থায় সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। ভাইসব! তোমাদের কারো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করে...
কিন্তু মহান রবের ফায়সালায় সামান্য সময়ের ব্যবধানে মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.) মাত্র ৩৮ বছর বয়সে এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন ৷
উমার (রা.) যখন এই সংবাদ শুনলেন তখন কান্নায় তাঁর দাড়ি ভিজে গিয়েছিল। তারপর তিনি ইয়াজিদ ইবন আবু সুফিয়ানকে পরবর্তী দায়িত্বশীল নির্ধারণ করে সেখানে প্রেরণ করলেন।
এই মহামারিতে শহীদদের মধ্যে রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাই ফুজাইল ইবন আব্বাস, আবু জান্দান বিন সুহাইল, হারিস ইবন হিশাম, আবু মালিক আশআরিসহ অনেক প্রথম সারির সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন।
প্রিয় পাঠক! এই মহামারিতে আমরা সাহাবাদের যতটুকু বিপর্যস্ত হতে দেখছি, তার চেয়ে অনেক বেশি রাসুলের দ্বিনের ওপর অবিচল থাকতে দেখতে পেয়েছি।
(৯)
===================================
(তাবেয়িযুগে মহামারি:)
ত্বাঊনে জারিফ, যাতে ব্যাপকসংখ্যক কোরআনের হাফেজ ও মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেছিলেন। এর সঠিক সময় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতভিন্নতা দেখা যায়। ৬৯, ৭০ ও ৭২ হিজরির ভিন্ন ভিন্ন তিনটি মত পাওয়া যায়। তবে ইবন হাজার (রহ.) ৬৯কে সমর্থন করেছেন। ত্বাঊনে ফাতায়াত, যা ৮৭ হিজরিতে আঘাত হেনেছিল। এতে সর্বাধিকসংখ্যক মহিলা ও যুবক শাহাদাতের সুধা পান করেন; যার কারণে ফাতায়াত বলে এটির নামকরণ হয়েছিল। ত্বাঊনে আদি ইবন আরত্বাত, যা ১০০ হিজরিতে শামে আঘাত হেনেছিল। অতঃপর ১২৭ হিজরিতে তাঊনে গোরাব। ১৩১ হিজরিতে বসরায় আঘাত হানে ত্বাঊনে সলম ইবন কুতাইবাহ, যা রজব মাসে শুরু হয়ে রমজানে তীব্র রূপ ধারণ করে এবং শাওয়ালে শেষ হয়। এতে প্রতিদিন অন্তত এক হাজার মানুষ ইন্তেকাল করেছে। ২২১ হিজরিতে বসরায় আরো একটি মহামারি আঘাত হানে, যাতে এত বেশি পরিমাণে লোক মারা যায় যে বলা হয়ে থাকে, কারো যদি সাতটি সন্তান থাকত, তাহলে গড়ে পাঁচজনই ইন্তেকাল করেছে। (বাজলুল মাঊন ফি ফাযলিত্ত্বাঊন, পৃষ্ঠা ৩৬১-৩৬৪)
প্রিয় পাঠক! ইসলামের ইতিহাসে মহামারির তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে শুধু সূচনালগ্নের বড় কয়েকটির কথা উল্লেখ করা হলো। বিস্তারিত জানতে ইবন হাজারের ‘বাজলুল মাঊন ফি ফাযলিত্ত্বাঊন’ গ্রন্থটি দেখতে পারেন।
ইসলামের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সংগঠিত এসব মহামারিতে যেমন মুসলমানদের জান ও মালের ক্ষতি হয়েছে, তেমনি ব্যাপক উন্নতি হয়েছে আত্মশুদ্ধি ও ঈমানের দৃঢ়তার। কাজেই আসুন, আমরাও এই মহামারিতে ভীত না হয়ে নবী নির্দেশনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি, সেই সঙ্গে মহান রবের কাছে সব কৃতকর্মের জন্য তওবা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব ধরনের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
(১০)
===================================
(মহামারি প্রতিরোধে হজরত ওমর (রা:) এর সিদ্ধান্তই ছিল যুগোপযোগী:)
৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৮ হিজরির ঘটনা। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন ইসলামি খেলাফতের আমির। সে সময় সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে দেখা দেয় মহামারি প্লেগ। খলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে জানতে পারেন সিরিয়ায় মহামারি প্লেগ দেখা দিয়েছে। তাতে তিনি তাঁর সিরিয়া সফর স্থগিত করেছিলেন। মহামারি প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষায় তা ছিল হজরত ওমরের সময়ের সেরা কার্যকরী সিদ্ধান্ত।
ইসলামি খেলাফতের প্রথম যুগে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে সিরিয়ায় মহামারি প্লেগ দেখা দেয়। সে সময় হজরত ওমর ছিলেন প্রায় অর্ধ জাহানের খলিফা। সে সময় সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে ছিল হজরত ওমরের রাষ্ট্রীয় সফর।
সফরের উদ্দেশ্যে তিনি মদিনা থেকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যান। মদিনা থেকে ‘সারগ’ নামক অঞ্চলে পৌছলে সেনাপতি আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু জানান যে, সিরিয়ায় প্লেগ তথা মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তিনি ইসলামে ইতিহাস এ ঘটনা তাউন আম্মাউস (طاعون عمواس) নামে পরিচিত। সে সময় তিনি সফর স্থগিত করেছিলেন। মুসলিম উম্মাহর জন্য তা ছিল অনেক বড় শিক্ষানীয় বিষয়।
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সে ঘটনায় রয়েছে করোনা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে রয়েছে উদ্দীপনা। আর তা তুলে ধরা হলো-
সিরিয়া মহামারি প্লেগ-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় হজরত ওমর প্রবীণ সাহাবাদের কাছে এ মর্মে পরামর্শ চান যে, তিনি সিরিয়া সফর করবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন? সাহাবাদের মধ্য থেকে দুইটি মতামত জানানো হয়-
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাষ্ট্রীয় সফরে মহামারী প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চলে যাবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন এ নিয়ে ৩টি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়-- প্রথমটি ছিল : প্রবীণ সাহাবাদের পরামর্শকিছু সাহাবা মতামত দিলেন যে, আপনি যে উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন, সে উদ্দেশে সফর অব্যাহত রাখেন। অর্থাৎ সিরিয়ায় যাওয়ার পক্ষে মত দেন। আবার কিছু সাহাবা বললেন, ‘খলিফার সিরিয়া যাওয়া উচিত হবে না।
- দ্বিতীয় ছিল : আনসার ও মুহাজিরদের পরামর্শ সভাহজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রবীণ সাহাবাদের কাছ থেকে দুইটি মতামত পাওয়ায় পুনরায় পরামর্শের জন্য আনসার ও মুহাজির সাহাবাদের ডাকলেন। তারাও মতপার্থক্য করলেন।
- সবশেষে ছিল : প্রবীন কুরাইশদের পরামর্শ সভাখলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সবশেষে প্রবীণ কুরাইশদের ডাকলেন। তারা কোনো মতানৈক্য না করে সবাই এ মর্মে মতামত ব্যক্ত করলেন যে-‘সিরিয়ার সফর স্থগিত করে আপনার মদিনায় প্রত্যাবর্তন করা উচিত। আপনি আপনার সঙ্গীদের মহামারী প্লেগের দিকে ঠেলে দেবেন না।’
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রবীণ কুরাইশদের মতামত গ্রহণ করে সিরিয়ার সফর স্থগিত করে মদিনায় ফিরে গেলেন।
খলিফার মদিনায় ফেরত যাওয়া দেখে সেনাপতি হজরত উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদির থেকে পলায়ন করে ফিরে যাচ্ছেন?’
সেনাপতি হজরত আবু উবাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে এ কথা শুনে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কষ্ট পেলেন। প্রিয় মানুষের কাছে যেভাবে আপনজন কষ্ট পায়। কেননা হজরত আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন খলিফার অনেক পছন্দ ও ভালোবাসা পাত্র। তাছাড়া সেনাপতি আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবাদের অন্যতম একজন।
তখন হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আবু উবায়দাহ! এ কথাটি তুমি না বলে যদি অন্য কেউ বলতো! তিনি সেনাপতির কথার উত্তরে বললেন- ‘হ্যাঁ’, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আরেক তাকদিরের দিকে ফিরে যাচ্ছি।’ হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতি আবু উবায়দাহকে এ কথা বুঝাতে একটি উদাহরণ তুলে ধরেন এবং বললেন-‘তুমি বলতো, তোমার কিছু উটকে তুমি এমন কোনো উপত্যকায় নিয়ে গেলে যেখানে দুইটি মাঠ আছে। মাঠ দুইটির মধ্যে একটি মাঠ সবুজ শ্যামলে ভরপুর। আর অন্য মাঠটি একেবারে শুষ্ক ও ধূসর। এখানে উট চরানো নিয়ে বিষয়টি কি এমন নয় যে, ‘তুমি সবুজ-শ্যামল মাঠে উট চরাও। আর তা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তা-ও আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী চরিয়েছ।
এ উপমায় হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতিকে এ কথাই বলতে চাচ্ছেন যে, হাতে সুযোগ থাকতে ভালো গ্রহণ করার মানে এই নয় যে, আল্লাহর তাকদির থেকে পালিয়ে যাওয়া।’
সে সময় হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি হাদিস বর্ণনা করেন। সে হাদিসের বর্ণনায় হজরত আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জিজ্ঞাসার পরিপূর্ণ সমাধান ওঠে আসেছে।
হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস শোনালেন। আর তাহলো-‘তোমরা যখন কোনো এলাকায় মহামারী প্লেগের বিস্তারের কথা শুনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়েও যেও না।’ (বুখারি)
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে যাওয়ার সমাধান যেভাবে এ হাদিসের মাধ্যমে এসেছিল। এ হাদিসের ওপর যথাযথ আমলই বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে করোনাসহ সব সংক্রামক মহামারী রোগ-ব্যাধিতে হাদিসের ওপর আমল ও সতর্ক থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
(১১)
===================================
(সংক্রমন সংক্রান্ত:)
ছোঁয়াচে রোগ বা রোগের সংক্রমণ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা বাস্তবেও দেখতে পাই যে, রোগীর কাছে, বা চারপাশে থেকেও অনেক মানুষ সুস্থ রয়েছেন।
আবার অনেক সতর্কতার পরেও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন রোগে। বস্তুত শুধু রোগজীবাণুর সংক্রমনেই যদি রোগ হতো তাহলে আমরা সকলেই অসুস্থ হয়ে যেতাম; কারণ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রকারের রোগজীবাণু আমাদের দেহে প্রবেশ করছে।
রোগজীবাণুর পাশাপাশি মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, রোগ জীবাণুর কর্মক্ষমতা ইত্যাদি অনেক কিছুর সমন্বয়ে মানুষের দেহে রোগের প্রকাশ ঘটে।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
وَعَنْهُ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ ، وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الْأَسَدِ . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
৪৫৭৭-[২] উক্ত রাবী (হুরায়রা (রাঃ) হতে) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের সংক্রমণ বলতে কিছুই নেই, কোন কিছুতে অশুভ নেই। প্যাঁচার মধ্যে কু-লক্ষণ নেই এবং সফর মাসেও কোন অশুভ নেই। তবে কুষ্ঠরোগী হতে পলায়ন করো, যেমন- তুমি বাঘ হতে পালিয়ে থাকো। (বুখারী)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৫৭০৭, আল জামি‘উস্ সগীর ১৩৪৮৭, সহীহুল জামি‘ ৭৫৬০, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৮২, ৭৮৩; আহমাদ ৯৭২২, ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৪৫৪৩, মুসান্নাফ ‘আবদুর রায্যাক ১৯৫০৮।
আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) বললেন, সংক্রমনের অস্তিত্ব নেই। তখন এক বেদুঈন বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার উটগুলো হরিনীর ন্যায় সুস্থ থাকে। এরপর একটি চর্মরোগে আক্রান্ত উট এগুলোর মধ্যে প্রবেশ করার পরে অন্যান্য উটও আক্রান্ত হয়ে যায়।
তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) বলেন, তাহলে প্রথম উটটিকে কে সংক্রমিত করল? (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৬১, ২১৭৭; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৪২)
পাশাপাশি সংক্রমনের বিষয়ে সতর্ক হতেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অসুস্থকে সুস্থের মধ্যে নেয়া হবে না (রুগ্ন উট সুস্থ উটের কাছে নেবে না)। (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৭৭; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৪২-১৭৪৩)
‘যদি তোমরা শুনতে পাও যে, কোনো জনপদে প্লেগ বা অনুরূপ মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তবে তোমরা তথায় গমন করবে না। আর যদি তোমরা যে জনপদে অবস্থান করছ তথায় তার প্রাদুর্ভাব ঘটে তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না। (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৬৩; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৩৮, ১৭৩৯)
একটি হাদীসে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে মানুষের জমায়েত থেকে ফিরে তার আবাসে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উক্ত হাদীসের বিবরণ হলো–
عَنْ عَمْرِو بْنِ الشَّرِيدِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ فِي وَفْدِ ثَقِيفٍ رَجُلٌ مَجْذُومٌ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّا قَدْ بَايَعْنَاكَ فَارْجِعْ
হযরত আমর ইবনে শারীদ স্বীয় পিতা শারীদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, বনী সাক্বীফের প্রতিনিধি দলে একজন ব্যক্তি কুষ্ঠরোগী ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট সংবাদ পাঠিয়ে বললেন–“নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে বাই‘আত করে নিয়েছি। সুতরাং তুমি ফিরে যাও।”
(সহীহু মুসলিম, হাদীস নং ২২৩১)
এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) প্রায় দেড় হাজার বৎসর পূর্বে সংক্রমন প্রতিরোধে বিচ্ছিন্নকরণ (quarantine) ব্যবস্থার নির্দেশনা প্রদান করেন।
মুমিন বিশ্বাস করেন যে, সকল বিষয়ের ন্যায় রোগের ক্ষেত্রেও আল্লাহর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এজন্য সংক্রমনের ভয়ে অস্থির বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
পাশাপাশি যে সব রোগের বিস্তারে সংক্রমন একটি উপায় বলে নিশ্চিত জানা যায় সে সকল রোগের বিস্তার রোধের ও সংক্রমন নিয়ন্ত্রনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
(১২)
===================================
(মহামারির সময় বাড়িতে নামাজ আদায় সংক্রান্ত :)
"হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে হারেছ (রা:) হতে বর্ণিত ৷ তিনি বলেন, এক বর্ষণমুখর দিনে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা:) মুয়ায্যিনকে বললেন: যখন তুমি (আযানে) 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বলবে, তখন 'হাইয়া আলাস্ সালাহ্' বলবে না, বলবে 'সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম' ( তোমরা নিজ নিজ গৃহে নামাজ আদায় কর ) তা লোকেরা অপছন্দ করল ৷ তখন তিনি বললেন: আমার চাইতে উত্তম ব্যক্তি {রাসূল(স:)} তা করেছেন ৷ জুম'আ নিঃসন্দেহে জরুরী ৷ আমি অপছন্দ করি যে, আপনাদেরকে মাঠি ও কাদার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করার অসুবিধায় ফেলি ৷" ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৯০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৯৯)
সুনানু আবি দাউদে আবনে আব্বাস(রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে ৷ তিনি বলেন, রাসূল(স:) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুয়ায্যিনের আযান শুনে বিনা কারণে মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামায়াতে নামায আদায় করবে না, তার অন্যত্রে আদায়কৃত নামায আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না ৷ ( অর্থাৎ, পরিপূর্ণ নামায হিসেবে গণ্য হবে না ৷) সাহাবীরা ওজর (অজুহাত) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূল(স:) বললেন : যদি কেউ ভয়ভীতি ও অসুস্থতার কারণে জামায়াতে উপস্থিত হতে অক্ষম হয় তবে তার জন্য বাড়িতে নামায পড়া দূষণীয় নয় ৷ (সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং-৫৫১)
অত্র হাদীসদ্বয়ে অতিবৃষ্টি, ভয়ভীতি ও অসুস্থতার কারণে মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামাজ পড়ার জন্য বলা হয়েছে ৷ আর বর্তমান করোনাভাইরাস এমন এক মহামারি যার কারণে মানুষের মৃত্যু হতে পারে ৷ সুতরাং এই মহামারির অবস্থায় মসজিদে না গিয়ে সাময়িকভাবে ঘরে নামাজ পড়া অধিকতর যুক্তিসঙ্গত ৷
সহীহ বুখারী শরিফে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল(স:) বলেছেন: যখন বান্দা রোগাক্রান্ত হয় কিংবা সফর করে, তখন তার জন্য তাই লিখিত হয়, যা সে মুকিম অবস্থায় বা সুস্থ অবস্থায় আমল করত ৷ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৯৯৬)
করোনাভাইরাস এক প্রকার ওজর (অজুহাত) ৷ তাই এই ভাইরাস থেকে আত্মরক্ষার্থে মসজিদে জামায়াতে নামায আদায় না করে ঘরে আদায় করলেও একই সাওয়াব পাওয়া যাবে ইনশা'আল্লাহ ৷
(১৩)
===================================
(সরকারি নির্দেশনা ও করণীয় :)
যে কোনো মহামারিতে সরকার কর্তৃক কোনো নির্দেশনা আসলে তা ইসলাম বিরোধী না হলে অবশ্য পালনীয় ৷ কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন—
يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوٓا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِى الْأَمْرِ مِنكُمْ
হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। (সূরা-নিসা:৫৯)
মহামারির ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানিদের দেয়া করণীয় মেনে চলা প্রয়োজন ৷ বিশেষ করে কুরআন আর হাদীস কর্তৃক করণীয় মেনে চলতে হবে এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখতে হবে ৷
(১৪)
==================================
(প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল:)
কেউ কেউ বলছে, 'আরে, আল্লাহ চাইলে মৃত্যু হবেই। এতো চিন্তার কি আছে?' কথা সত্য। কিন্তু, তাওয়াক্কুলের সংজ্ঞাটা এরকম না। এক সাহাবি একবার নবীজীর কাছে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'আগে ঘোড়াটাকে রশি দিয়ে খুঁটিতে বাঁধবে, এরপর তাওয়াক্কুল করবে'।
মানে হলো, আগে সতর্কতার সবকটা স্তর পূরণ করতে হবে। সাথে তাওয়াক্কুল। সতর্ক না হয়ে, 'আরে কিছু হবেনা' টাইপ কথা বলার মধ্যে সঠিক তাওয়াক্কুল নেই।
(*) قُل لَّن يُصِيبَنَآ إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلٰىنَا ۚ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
বল, ‘আমাদেরকে শুধু তা-ই আক্রান্ত করবে যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক, আর আল্লাহর উপরই যেন মুমিনরা তাওয়াক্কুল করে’। (সূরা-তাওবাহ:৫১)
(*) وَأَنفِقُوا فِى سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ۛ وَأَحْسِنُوٓا ۛ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর এবং নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর সুকর্ম কর। নিশ্চয় আল্লাহ সুকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন। (সূরা-বাকারাহ:১৯৫)
*হযরত মুসা(আ:) এর অনুসারীদেরসহ যখন ফেরাউন ধাওয়া করলেন পিছন দিক থেকে, তখন হযরত মুসা(আ:) কিন্তু আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেননি ৷ আল্লাহর আদেশে তিনি লাঠি দ্বারা আঘাত হানলেন; ফলে সাগরে রাস্তার হয়ে যায় ৷ অতচ আল্লাহ চাইলে এমনিতে লাঠির আঘাত ছাড়া সাগরে রাস্তা করে দিতে পারতেন ৷ অতএব তিনি প্রচেষ্টা করার শিক্ষা দিলেন ৷
*হযরত নূহ(আ:) যুগে মহাপ্রলয় হওয়ার সময় তিনি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেননি ৷ তিনি আল্লাহর আদেশে নৌকা তৈরি করলেন ৷ অতচ আল্লাহ চাইলে নৌকা ছাড়াই নূহ(আ:) ও তার সাথীদের মহাপ্রলয় থেকে বাচাতে পারতেন ৷ অতএব, তিনি প্রচেষ্টার শিক্ষা দিলেন ৷
*হযরত মুহাম্মদ(স:) যখন মক্কায় কুরাইশ কর্তৃক নির্যাতিত ও হত্যার হুমকির সম্মুখিন হলেন, তখন তিনি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেননি; বরং, আল্লাহর আদেশে হিজরত করলেন মদিনাতে ৷ অতচ আল্লাহ চাইলে কোনো উপায় ছাড়া রাসূল(স:)কে রক্ষা করতে পারতেন ৷ অতএব, হিজরতের মাধ্যমে প্রচেষ্টা করার শিক্ষা দিলেন ৷
এরপরও যারা 'যা হওয়ার হবে' বলে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেন ৷ তারা একটু ভাবুন, পানিতে সাঁতার না কেটে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে থাকলে কিন্তু আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করবেন না ৷ কেননা আপনার প্রচেষ্টা নাই বলে ৷ গাছের উপর বসে থেকে আল্লাহ খাওয়াই দিবে বলে চুপ থাকলে, তাতে কখনো আপনি খাদ্যের গন্ধ পাবেন না ৷ কেননা আপনার প্রচেষ্টা না থাকলে তিনি রিজিক আপনাকে কেন দিবে?
অতচ, আল্লাহ চাইলে সবকিছু করতে পারেন ৷ কিন্তু তিনি সবাইকে প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম করার শিক্ষা দিয়েছেন ৷ সুতরাং প্রচেষ্টাও করতে হবে এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলও রাখতে হবে ৷ দুটোর সমন্বয়ে আল্লাহ সফলতা দান করেন ৷ অতএব, মহামারির সময় যাবতীয় করণীয় পালনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে ৷
(১৫)
===================================(মহামারিতে প্রচলিত কুসংস্কার:)
মহামারির সময় দেখা যায় অনেক ধরনের সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার যা ইসলামে স্বীকৃত নয় ৷ যেমন: বিভিন্ন ঝাড়পুক ও দোয়ার কাগজ লিখে ছাগল গ্রামের চতুর্দিকে ঘুরিয়ে জবাই করার মাধ্যমে পাড়া বন্ধ (পাড়া বন) করার মত কুসংস্কার সমাজে প্রচলিত আছে যা বড় ধরনের বিদয়াত ও অনৈসলামিক কাজ ৷ এটা ইসলাম সমর্থন করে না এমনকি রাসূল(স:), সাহাবী ও তাবেয়িদের যুগেও এরকম কর্মের প্রমাণ মিলে না ৷ সুতরাং, এককথায় ইসলাম বিরোধী কাজ ও কুসংস্কার ৷
কুরআনে চুল পাওয়া এবং তা খেলে 'করোনার' মত মহামারি রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলেও কুসংস্কার দেখা দিয়েছে ৷
একজোগে সম্মিলিতভাবে আযান দেওয়ার মত কুসংস্কার দেখা দিয়েছে ৷ অতচ, রাসূল(স:)এর যুগে এ ধরনের কোনো আমল পরিলক্ষিত হয়নি ৷
আসলে এই ধরনের কুসংস্কার সৃষ্টির পিছনে কিছু কাঠ মোল্লাহ আর সমাজের কিছু নামধারি দূষিত মুসলিমদের মনগড়া প্রচেষ্টা রয়েছে ৷ বিশেষ করে কাফের-মুশরিকদের মত বাপ-দাদাদের অনৈসলামিক কর্ম অনুসরণে তৎপরতার কারণ ৷
আল্লাহ বলেন—
(*) أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوٓا أَن يَقُولُوٓا ءَامَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? (সূরা-আনকাবুত:০২)
সুতরাং মহামারি একটি আল্লাহর পরীক্ষা ৷ এ সময় ধৈর্য ধরতে হবে ৷ কিন্তু ইসলামে নতুন কিছু সৃষ্টি করা যাবে না ৷ ঈমান এনেছি বলে কিন্তু কুসংস্কার প্রচলন করে জান্নাতে যাওয়া যাবে না ৷ আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তির্ণ হতে হবে ৷
আল্লাহ সবাইকে উপরিল্লিখিত বিষয়াবলি বুঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুক ৷ আমিন ৷
বিস্তারিত পড়ে থাকলে এই বিষয়ে আপনার মতামত জানাবেন ৷ খুশি হব ৷ এটি সম্পন্ন করতে অনেক কষ্ট হয়েছে ৷ "আল্লাহ হাফেজ"-(RSD RASHID)
বিষয়সূচি:
=======
১. মহামারি আসার কারণ:
২. মহামারিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি:
৩. মহামারি নিয়ে রাসূল(স:) এর ভবিষ্যদ্বাণী:
৪. মহামারি দেখা দিলে করণীয়:
৫. মহামারিতে মারা গেলে শাহাদাতের মর্যাদা:
৬. মহামারিতে পড়ার দোয়াসমূহ:
৭. সাহাবাযুগে মহামারি:
৮. মহামারি বিস্তারের অনুকুল অবস্থা ও প্রেক্ষাপট:
৯. তাবেয়িযুগে মহামারি:
১০. মহামারি প্রতিরোধে হজরত ওমর (রা:) এর সিদ্ধান্তই ছিল যুগোপযোগী:
১১. সংক্রমন সংক্রান্ত:
১২. মহামারির সময় বাড়িতে নামাজ আদায় সংক্রান্ত:
১৩. সরকারি নির্দেশনা ও করণীয় :
১৪. প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল:
১৫. মহামারিতে প্রচলিত কুসংস্কার:
(১)
===================================
(মহামারি আসার কারণ:)
মহামারি আসার কারণ সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত:
(*) ظَهَرَ الْفَسَادُ فِى الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِى عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। (সূরা-রূম:৪১)
(*) وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِن قَبْلِكُمْ لَمَّا ظَلَمُوا ۙ وَجَآءَتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنٰتِ وَمَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا ۚ كَذٰلِكَ نَجْزِى الْقَوْمَ الْمُجْرِمِينَ
আর অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, যখন তারা যুলম করেছে। আর তাদের নিকট তাদের রাসূলগণ প্রমাণাদিসহ আগমন করেছিল, কিন্তু তারা ঈমান আনার ছিল না। এভাবে আমি অপরাধী কওমকে শাস্তি প্রদান করি। (সূরা-ইউনুস:১৩)
(*) وَلَقَدْ أَرْسَلْنَآ إِلٰىٓ أُمَمٍ مِّن قَبْلِكَ فَأَخَذْنٰهُم بِالْبَأْسَآءِ وَالضَّرَّآءِ لَعَلَّهُمْ يَتَضَرَّعُونَ
আর আমি তোমাদের পূর্বেকার জাতিসমূহের কাছে বহু রাসূল পাঠিয়েছি, আমি তাদের প্রতি ক্ষুধা, দারিদ্রতা ও রোগ ব্যাধি চাপিয়ে দিয়েছি, যেন তারা নম্রতা প্রকাশ করে আমার সামনে নতি স্বীকার করে। (সূরা-আন'আম:৪২)
(*) وَمَآ أَصٰبَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَن كَثِيرٍ
আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন। (সূরা-আশ-শুরা:৩০)
(*) فَلَوْلَا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِن قَبْلِكُمْ أُولُوا بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِى الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّنْ أَنجَيْنَا مِنْهُمْ ۗ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَآ أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ
অতএব তোমাদের পূর্বের প্রজন্মসমূহের মধ্যে এমন প্রজ্ঞাবান কেন হয়নি, যারা যমীনে ফাসাদ করা থেকে নিষেধ করত? অল্প সংখ্যক ছাড়া, যাদেরকে আমি তাদের মধ্য থেকে নাজাত দিয়েছিলাম। আর যারা যুলম করেছে, তারা বিলাসিতার পেছনে পড়ে ছিল এবং তারা ছিল অপরাধী। (সূরা-হুদ:১১৬)
(*) وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَىْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوٰلِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرٰتِ ۗ وَبَشِّرِ الصّٰبِرِينَ
আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। (সূরা-বাকারাহ:১৫৫)
মহামারি আসার কারণ সম্পর্কিত হাদীস:
‘যখন কোনো কওমের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তা প্রকাশ্যেও করতে শুরু করে তবে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৪০১৯)।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্লেগ রোগ (মহামারি) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। আল্লাহর নবী (সা.) তাঁকে জানান, এটি হচ্ছে এক ধরনের শাস্তি। আল্লাহ যার ওপর তা পাঠাতে ইচ্ছে করেন, পাঠান। কিন্তু আল্লাহ এটিকে মুমিনের জন্য রহমত বানিয়েছেন। অতএব প্লেগ রোগে কোনো বান্দা যদি ধৈর্য ধরে এবং এ বিশ্বাস নিয়ে আপন শহরে অবস্থান করতে থাকে যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না; তাহলে সেই বান্দার জন্য থাকবে শহীদের সাওয়াবের সমান সাওয়াব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৩৪)
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘গোনাহের কারণে মানুষের রিজিক কমে যায়।’ (ইবনে মাজাহ: ৪০২২)
(২)
===================================(মহামারিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি:)
অতীতেও আল্লাহ পাপাচারের শাস্তি হিসেবে মহামারি প্রাদুর্ভাব ঘটান এবং সে জাতিকে ধ্বংস করে দেন। দাউদ (আ.)-এর যুগে এমন ঘটনা ঘটেছিল। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তুমি কি তাদের দেখনি যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি ত্যাগ করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের বলেছিলেন, তোমাদের মৃত্যু হোক। তারপর আল্লাহ তাদের জীবিত করেন। ...’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৪৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তারা সংখ্যায় ছিল চার হাজার। মহামারির ভয়ে তারা পালিয়ে ছিল। তারা বলেছিল, আমরা এমন ভূমিতে যাব যেখানে মৃত্যু নেই। অতঃপর তারা এক স্থানে একত্র হলো। তখন আল্লাহ তাদের ওপর মৃত্যুর ফরমান জারি করেন।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)
এ ছাড়া একটি হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় আল্লাহ অতীতের কোনো কোনো গোত্রকে মহামারির মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছেন। মহামারি প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটি আল্লাহর গজব বা শাস্তি, বনি ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীর ওপর এসেছিল, তার বাকি অংশই হচ্ছে মহামারি। অতএব, কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস : ১০৬৫)
(৩)
===================================
(মহামারি নিয়ে রাসূল(স:) এর ভবিষ্যদ্বাণী:)
এই মহামারি থেকে আল্লাহ পবিত্র নগরী মদিনাকে রক্ষা করবেন বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মদিনায় ঢুকতে পারবে না দাজ্জাল, আর না কোনো মহামারি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৩১)
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের আগের ছয়টি নিদর্শন গণনা করে রাখো। আমার মৃত্যু, অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়, অতঃপর তোমাদের মধ্যে ঘটবে মহামারি, বকরির পালের মহামারির মতো, সম্পদের প্রাচুর্য, এমনকি এক ব্যক্তিকে একশ’ দিনার দেয়ার পরও সে অসন্তুষ্ট থাকবে। অতঃপর এমন এক ফিতনা আসবে, যা আরবের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে। অতঃপর যুদ্ধবিরতির চুক্তি, যা তোমাদের ও বনি আসফার বা রোমকদের মধ্যে সম্পাদিত হবে। অতঃপর তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং ৮০টি পতাকা উড়িয়ে তোমাদের বিপক্ষে আসবে; প্রতিটি পতাকার নিচে থাকবে ১২ হাজার সৈন্য। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১৭৬)
(৪)
===================================(মহামারি দেখা দিলে করণীয়:)
যেকোনো বিপদে বান্দা আল্লাহমুখী হোক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা ও আশ্রয় প্রার্থনা করুক এটাই মহান প্রতিপালক আল্লাহর প্রত্যাশা। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে বিপদে আল্লাহমুখী হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তাই মহামারি দেখা দিলে মুমিনের প্রধান কাজ হলো নিজের ভুল ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে বিনীত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনীত হলো না এবং কাতর প্রার্থনাও করে না।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৭৬)
(*) ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
তোমরা তোমাদের রবকে ডাক অনুনয় বিনয় করে ও চুপিসারে। নিশ্চয় তিনি পছন্দ করেন না সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে। (সূরা-আরাফ:৫৫)
(*) وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِى وَلْيُؤْمِنُوا بِى لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। (সূরা-বাকারাহ:১৮৬)
বেশির ভাগ মহামারিই সংক্রামক। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) মহামারির সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত অঞ্চলে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। মুমিন ঈমান ও ইখলাসের সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা কোথাও মহামারির সংবাদ পাবে তখন সেদিকে যেও না। আর যদি তোমরা মহামারীতে আক্রান্ত ভূমিতে পূর্ব থেকেই অবস্থান করো তাহলে সেখান থেকে পালিয়ো না। (বুখারী: ৫৭৩৯, মুসলিম: ২২১৯)।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় পাওয়া যায় শামে মহামারি দেখা দিলে ওমর (রা.) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফর স্থগিত করেন। (হাদিস : ৫৭২৯)
(৫)
===================================
(মহামারিতে মারা গেলে শাহাদাতের মর্যাদা:)
আল্লাহ তাআলা শাস্তি হিসেবে মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটান। যেন বান্দা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। সুতরাং মহামারি দেখা দিলে কোনো বান্দা যদি আল্লাহর কাছে বিনীত হয়ে তাওবা করে এবং রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ মোতাবেক ধৈর্যের পরীক্ষা দেয়, তবে আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দান করবেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পেটের রোগে মারা গেলে শহীদ, প্লেগে মারা শহীদ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৩৩)
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, পাঁচ প্রকার মৃত শহীদ—মহামারিতে মৃত, পেটের পীড়ায় মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত এবং যে আল্লাহর পথে শহীদ হলো। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮২৯)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, মহামারিতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৩০)
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ জেনে রাখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সূরা ইউনূস : ৬২)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি মহামারিতে পতিত হয় এবং নেকির আশায় সে ধৈর্য্যসহকারে সেখানে অবস্থান করে এবং এ বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ তাআলার হুকুম ব্যতিত কিছুই হয় না, তাহলে সে শহীদের সওয়াব পায়। (বুখারী শরীফ : ৫৪০২)।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে কোনো ব্যক্তি মহামারীর সময় নিজেকে ঘরে রুদ্ধ রাখবে ধৈর্যসহকারে, সওয়াবের আশায় এবং এই বিশ্বাস নিয়ে যে, আল্লাহ তার ভাগ্যে যা লিখেছেন এর বাইরে কিছুই ঘটবে না, সে শহীদের মর্যাদা ও বিনিময় লাভ করবে। (-ফতহুল বারী শরহে বুখারী, ১৯৪/১০)
(৬)
===================================
(মহামারিতে পড়ার দোয়াসমূহ:)
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত দোয়াটি সন্ধ্যায় তিনবার পাঠ করবে সকাল হওয়া পর্যন্ত তার প্রতি কোনো বিপদ হঠাৎ চলে আসবে না। আর যে তা সকালে তিনবার পাঠ করবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ওপর কোনো হঠাৎ বিপদ আসবে না। দোয়াটি হলো,
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
অর্থ : ‘আল্লাহর নামে যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো বস্তুই ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৮৮ & তিরমিজি:৩৩৮৮)
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, (রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য) নবী (সা.) পড়তেন,
> اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَ الْجُنُوْنِ وَ الْجُذَامِ وَمِنْ سَىِّءِ الْاَسْقَامِ
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেত, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সব দুরারোগ্য ব্যাধি হতে।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৫৫৪)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘর থেকে বের হতেন তখন এ দুআ পড়তেন, বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। (আবু দাউদ: ৫০৯৫)।
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন’ দুআটি বেশি বেশি পাঠ করা।
বেশি বেশি দান-সাদকা ও মাতা-পিতার সেবা করা, পরিবারের লোকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। নবী (সা.) বলেন, দান-সাদকা ও সৎ কর্ম অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে।
তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে দুআ করা। নবী সা. বলেন, তাহাজ্জুদের সালাত শরীরের যাবতীয় রোগবালাই দূর করে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং ঘরবাড়ি ও আঙ্গিনা পরিচ্ছন্ন রাখা। যত্রতত্র কফ, থুথু এবং নাকের ময়লা না ফেলা।
অজুঅবস্থায় থাকা। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ। (মুসলিম, হাদিস : ৪২২)
(৭)
===================================
(সাহাবাযুগে মহামারি)
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় বড় মহামারি হয়েছে। মহামারি দেখা দিয়েছিল সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়িদের সোনালি যুগেও। নিম্নে তেমন কিছু ঘটনা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো—
আবদুল্লাাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে উমার (রা.) শামের দিকে রওনা হলেন। ‘সারগ’ পর্যন্ত পৌঁছলে ‘আজনাদ’ অধিবাসীদের (প্রতিনিধি ও অধিনায়ক) আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তখন তাঁরা খবর দিলেন যে শামে মহামারি শুরু হয়ে গেছে ৷ উমার (রা.) লোকদের মাঝে ঘোষণা দিলেন, ‘আমি ফজর পর্যন্ত সওয়ারির ওপর থাকব, তোমরাও (ফজর পর্যন্ত সওয়ারির ওপর) অবস্থান করো।’ তখন আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) বললেন, আল্লাহর তাকদির থেকে পলায়ন করে? তখন উমার (রা.) বললেন, ‘হে আবু উবায়দা! হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর তাকদির থেকে আল্লাহরই তাকদিরের দিকে পলায়ন করছি। তোমার যদি একপাল উট থাকে আর তুমি একটি উপত্যকায় অবতীর্ণ হওয়ার পর দেখো যে দুটি প্রান্তর রয়েছে, যার একটি সবুজ শ্যামল, অপরটি শূন্য। সে ক্ষেত্রে তুমি যদি সবুজ শ্যামল প্রান্তরে (উট) চরাও, তাহলে আল্লাহর তাকদিরেই সেখানে চরাবে, আর যদি তৃৃণশূন্য প্রান্তরে চরাও, তাহলেও আল্লাহর তাকদিরেই সেখানে চরাবে।’ বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় আবদুর রাহমান ইবন আউফ (রা.) এলেন, তিনি (এতক্ষণ) তাঁর কোনো প্রয়োজনে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে (হাদিসের) ইলম রয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা কোনো এলাকায় এর সংবাদ শুনতে পাও তখন তার ওপরে (দুঃসাহস দেখিয়ে) এগিয়ে যেয়ো না। আর যখন কোনো দেশে তোমাদের সেখানে থাকা অবস্থায় দেখা দেয় তখন তা থেকে পলায়ন করে বেরিয়ে পোড়ো না।’ বর্ণনাকারী বলেন, তখন উমার (রা.) আল্লাহর হামদ করলেন। তারপর চলে গেলেন। (মুসলিম, হাদিস : ৫৫৯১)
(৮)
===================================
(মহামারি বিস্তারের অনুকুল অবস্থা ও প্রেক্ষাপট:)
শামে মুসলিম ও রোমান বাহিনীর মধ্যে সংগঠিত যুদ্ধে অসংখ্য রোমান সেনা নিহত হয়। মুসলিম সেনাদের লাশ দাফন করার ব্যবস্থা হলেও রোমানদের লাশ দাফন করা হয়নি। জনমানবহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে অসংখ্য লাশ। একটু একটু করে লাশ পচে-গলে দূষিত হতে থাকে আবহাওয়া আর জলাধার। এতে করেই সেখান থেকে সৃষ্ট নানা জীবাণু বিস্তার লাভ করে এবং মহামারির রূপ ধারণ করে। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের এমন মতামতই তুলে ধরেছেন হাল আমলের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আলী সাল্লাবী ও রাগিব সারজানী। ইবন হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, ‘এটা ছিল শরীরে এক ধরনের ফোসকা ও একটু বড় টিউমারের মতো।’ এই রোগে কেউ আক্রান্ত হলে পাঁচ দিনের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে তখন সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মুসলিম সেনা যুদ্ধ করছিলেন। তাঁদের ৮০ শতাংশ সেই মহামারিতে ইন্তেকাল করে শহীদের মর্যাদা লাভ করে।
আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) ও উমার (রা.)-এর মধ্যে মর্মস্পর্শী পত্র বিনিময়ের কথা আমরা সবাই জানি। অবশেষে মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.)-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) নিজেও এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে সহচরদের এই বলে উপদেশ দিতে দিতে ইন্তেকাল করেন যে ‘হে লোকসকল! এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে রহমত। তোমাদের নবীর দোয়ার প্রতিফল।’
আবু উবায়দা (রা.)-কে দাফন শেষে মুয়াজ (রা.) ভাষণ দিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার! তোমরা সকলেই কায়মনোবাক্যে তওবা করো। কারণ যে বান্দা প্রকৃত তওবা করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এই অবস্থায় সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। ভাইসব! তোমাদের কারো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করে...
কিন্তু মহান রবের ফায়সালায় সামান্য সময়ের ব্যবধানে মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.) মাত্র ৩৮ বছর বয়সে এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন ৷
উমার (রা.) যখন এই সংবাদ শুনলেন তখন কান্নায় তাঁর দাড়ি ভিজে গিয়েছিল। তারপর তিনি ইয়াজিদ ইবন আবু সুফিয়ানকে পরবর্তী দায়িত্বশীল নির্ধারণ করে সেখানে প্রেরণ করলেন।
এই মহামারিতে শহীদদের মধ্যে রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাই ফুজাইল ইবন আব্বাস, আবু জান্দান বিন সুহাইল, হারিস ইবন হিশাম, আবু মালিক আশআরিসহ অনেক প্রথম সারির সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন।
প্রিয় পাঠক! এই মহামারিতে আমরা সাহাবাদের যতটুকু বিপর্যস্ত হতে দেখছি, তার চেয়ে অনেক বেশি রাসুলের দ্বিনের ওপর অবিচল থাকতে দেখতে পেয়েছি।
(৯)
===================================
(তাবেয়িযুগে মহামারি:)
ত্বাঊনে জারিফ, যাতে ব্যাপকসংখ্যক কোরআনের হাফেজ ও মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেছিলেন। এর সঠিক সময় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতভিন্নতা দেখা যায়। ৬৯, ৭০ ও ৭২ হিজরির ভিন্ন ভিন্ন তিনটি মত পাওয়া যায়। তবে ইবন হাজার (রহ.) ৬৯কে সমর্থন করেছেন। ত্বাঊনে ফাতায়াত, যা ৮৭ হিজরিতে আঘাত হেনেছিল। এতে সর্বাধিকসংখ্যক মহিলা ও যুবক শাহাদাতের সুধা পান করেন; যার কারণে ফাতায়াত বলে এটির নামকরণ হয়েছিল। ত্বাঊনে আদি ইবন আরত্বাত, যা ১০০ হিজরিতে শামে আঘাত হেনেছিল। অতঃপর ১২৭ হিজরিতে তাঊনে গোরাব। ১৩১ হিজরিতে বসরায় আঘাত হানে ত্বাঊনে সলম ইবন কুতাইবাহ, যা রজব মাসে শুরু হয়ে রমজানে তীব্র রূপ ধারণ করে এবং শাওয়ালে শেষ হয়। এতে প্রতিদিন অন্তত এক হাজার মানুষ ইন্তেকাল করেছে। ২২১ হিজরিতে বসরায় আরো একটি মহামারি আঘাত হানে, যাতে এত বেশি পরিমাণে লোক মারা যায় যে বলা হয়ে থাকে, কারো যদি সাতটি সন্তান থাকত, তাহলে গড়ে পাঁচজনই ইন্তেকাল করেছে। (বাজলুল মাঊন ফি ফাযলিত্ত্বাঊন, পৃষ্ঠা ৩৬১-৩৬৪)
প্রিয় পাঠক! ইসলামের ইতিহাসে মহামারির তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে শুধু সূচনালগ্নের বড় কয়েকটির কথা উল্লেখ করা হলো। বিস্তারিত জানতে ইবন হাজারের ‘বাজলুল মাঊন ফি ফাযলিত্ত্বাঊন’ গ্রন্থটি দেখতে পারেন।
ইসলামের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সংগঠিত এসব মহামারিতে যেমন মুসলমানদের জান ও মালের ক্ষতি হয়েছে, তেমনি ব্যাপক উন্নতি হয়েছে আত্মশুদ্ধি ও ঈমানের দৃঢ়তার। কাজেই আসুন, আমরাও এই মহামারিতে ভীত না হয়ে নবী নির্দেশনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি, সেই সঙ্গে মহান রবের কাছে সব কৃতকর্মের জন্য তওবা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব ধরনের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
(১০)
===================================
(মহামারি প্রতিরোধে হজরত ওমর (রা:) এর সিদ্ধান্তই ছিল যুগোপযোগী:)
৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৮ হিজরির ঘটনা। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন ইসলামি খেলাফতের আমির। সে সময় সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে দেখা দেয় মহামারি প্লেগ। খলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে জানতে পারেন সিরিয়ায় মহামারি প্লেগ দেখা দিয়েছে। তাতে তিনি তাঁর সিরিয়া সফর স্থগিত করেছিলেন। মহামারি প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষায় তা ছিল হজরত ওমরের সময়ের সেরা কার্যকরী সিদ্ধান্ত।
ইসলামি খেলাফতের প্রথম যুগে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে সিরিয়ায় মহামারি প্লেগ দেখা দেয়। সে সময় হজরত ওমর ছিলেন প্রায় অর্ধ জাহানের খলিফা। সে সময় সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে ছিল হজরত ওমরের রাষ্ট্রীয় সফর।
সফরের উদ্দেশ্যে তিনি মদিনা থেকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যান। মদিনা থেকে ‘সারগ’ নামক অঞ্চলে পৌছলে সেনাপতি আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু জানান যে, সিরিয়ায় প্লেগ তথা মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তিনি ইসলামে ইতিহাস এ ঘটনা তাউন আম্মাউস (طاعون عمواس) নামে পরিচিত। সে সময় তিনি সফর স্থগিত করেছিলেন। মুসলিম উম্মাহর জন্য তা ছিল অনেক বড় শিক্ষানীয় বিষয়।
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সে ঘটনায় রয়েছে করোনা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে রয়েছে উদ্দীপনা। আর তা তুলে ধরা হলো-
সিরিয়া মহামারি প্লেগ-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় হজরত ওমর প্রবীণ সাহাবাদের কাছে এ মর্মে পরামর্শ চান যে, তিনি সিরিয়া সফর করবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন? সাহাবাদের মধ্য থেকে দুইটি মতামত জানানো হয়-
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাষ্ট্রীয় সফরে মহামারী প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চলে যাবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন এ নিয়ে ৩টি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়-- প্রথমটি ছিল : প্রবীণ সাহাবাদের পরামর্শকিছু সাহাবা মতামত দিলেন যে, আপনি যে উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন, সে উদ্দেশে সফর অব্যাহত রাখেন। অর্থাৎ সিরিয়ায় যাওয়ার পক্ষে মত দেন। আবার কিছু সাহাবা বললেন, ‘খলিফার সিরিয়া যাওয়া উচিত হবে না।
- দ্বিতীয় ছিল : আনসার ও মুহাজিরদের পরামর্শ সভাহজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রবীণ সাহাবাদের কাছ থেকে দুইটি মতামত পাওয়ায় পুনরায় পরামর্শের জন্য আনসার ও মুহাজির সাহাবাদের ডাকলেন। তারাও মতপার্থক্য করলেন।
- সবশেষে ছিল : প্রবীন কুরাইশদের পরামর্শ সভাখলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সবশেষে প্রবীণ কুরাইশদের ডাকলেন। তারা কোনো মতানৈক্য না করে সবাই এ মর্মে মতামত ব্যক্ত করলেন যে-‘সিরিয়ার সফর স্থগিত করে আপনার মদিনায় প্রত্যাবর্তন করা উচিত। আপনি আপনার সঙ্গীদের মহামারী প্লেগের দিকে ঠেলে দেবেন না।’
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রবীণ কুরাইশদের মতামত গ্রহণ করে সিরিয়ার সফর স্থগিত করে মদিনায় ফিরে গেলেন।
খলিফার মদিনায় ফেরত যাওয়া দেখে সেনাপতি হজরত উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদির থেকে পলায়ন করে ফিরে যাচ্ছেন?’
সেনাপতি হজরত আবু উবাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে এ কথা শুনে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কষ্ট পেলেন। প্রিয় মানুষের কাছে যেভাবে আপনজন কষ্ট পায়। কেননা হজরত আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন খলিফার অনেক পছন্দ ও ভালোবাসা পাত্র। তাছাড়া সেনাপতি আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবাদের অন্যতম একজন।
তখন হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আবু উবায়দাহ! এ কথাটি তুমি না বলে যদি অন্য কেউ বলতো! তিনি সেনাপতির কথার উত্তরে বললেন- ‘হ্যাঁ’, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আরেক তাকদিরের দিকে ফিরে যাচ্ছি।’ হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতি আবু উবায়দাহকে এ কথা বুঝাতে একটি উদাহরণ তুলে ধরেন এবং বললেন-‘তুমি বলতো, তোমার কিছু উটকে তুমি এমন কোনো উপত্যকায় নিয়ে গেলে যেখানে দুইটি মাঠ আছে। মাঠ দুইটির মধ্যে একটি মাঠ সবুজ শ্যামলে ভরপুর। আর অন্য মাঠটি একেবারে শুষ্ক ও ধূসর। এখানে উট চরানো নিয়ে বিষয়টি কি এমন নয় যে, ‘তুমি সবুজ-শ্যামল মাঠে উট চরাও। আর তা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তা-ও আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী চরিয়েছ।
এ উপমায় হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতিকে এ কথাই বলতে চাচ্ছেন যে, হাতে সুযোগ থাকতে ভালো গ্রহণ করার মানে এই নয় যে, আল্লাহর তাকদির থেকে পালিয়ে যাওয়া।’
সে সময় হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি হাদিস বর্ণনা করেন। সে হাদিসের বর্ণনায় হজরত আবু উবায়দাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জিজ্ঞাসার পরিপূর্ণ সমাধান ওঠে আসেছে।
হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস শোনালেন। আর তাহলো-‘তোমরা যখন কোনো এলাকায় মহামারী প্লেগের বিস্তারের কথা শুনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়েও যেও না।’ (বুখারি)
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে যাওয়ার সমাধান যেভাবে এ হাদিসের মাধ্যমে এসেছিল। এ হাদিসের ওপর যথাযথ আমলই বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে করোনাসহ সব সংক্রামক মহামারী রোগ-ব্যাধিতে হাদিসের ওপর আমল ও সতর্ক থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
(১১)
===================================
(সংক্রমন সংক্রান্ত:)
ছোঁয়াচে রোগ বা রোগের সংক্রমণ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা বাস্তবেও দেখতে পাই যে, রোগীর কাছে, বা চারপাশে থেকেও অনেক মানুষ সুস্থ রয়েছেন।
আবার অনেক সতর্কতার পরেও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন রোগে। বস্তুত শুধু রোগজীবাণুর সংক্রমনেই যদি রোগ হতো তাহলে আমরা সকলেই অসুস্থ হয়ে যেতাম; কারণ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রকারের রোগজীবাণু আমাদের দেহে প্রবেশ করছে।
রোগজীবাণুর পাশাপাশি মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, রোগ জীবাণুর কর্মক্ষমতা ইত্যাদি অনেক কিছুর সমন্বয়ে মানুষের দেহে রোগের প্রকাশ ঘটে।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
وَعَنْهُ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ ، وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الْأَسَدِ . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
৪৫৭৭-[২] উক্ত রাবী (হুরায়রা (রাঃ) হতে) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের সংক্রমণ বলতে কিছুই নেই, কোন কিছুতে অশুভ নেই। প্যাঁচার মধ্যে কু-লক্ষণ নেই এবং সফর মাসেও কোন অশুভ নেই। তবে কুষ্ঠরোগী হতে পলায়ন করো, যেমন- তুমি বাঘ হতে পালিয়ে থাকো। (বুখারী)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৫৭০৭, আল জামি‘উস্ সগীর ১৩৪৮৭, সহীহুল জামি‘ ৭৫৬০, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৮২, ৭৮৩; আহমাদ ৯৭২২, ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৪৫৪৩, মুসান্নাফ ‘আবদুর রায্যাক ১৯৫০৮।
আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) বললেন, সংক্রমনের অস্তিত্ব নেই। তখন এক বেদুঈন বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার উটগুলো হরিনীর ন্যায় সুস্থ থাকে। এরপর একটি চর্মরোগে আক্রান্ত উট এগুলোর মধ্যে প্রবেশ করার পরে অন্যান্য উটও আক্রান্ত হয়ে যায়।
তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) বলেন, তাহলে প্রথম উটটিকে কে সংক্রমিত করল? (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৬১, ২১৭৭; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৪২)
পাশাপাশি সংক্রমনের বিষয়ে সতর্ক হতেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অসুস্থকে সুস্থের মধ্যে নেয়া হবে না (রুগ্ন উট সুস্থ উটের কাছে নেবে না)। (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৭৭; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৪২-১৭৪৩)
‘যদি তোমরা শুনতে পাও যে, কোনো জনপদে প্লেগ বা অনুরূপ মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তবে তোমরা তথায় গমন করবে না। আর যদি তোমরা যে জনপদে অবস্থান করছ তথায় তার প্রাদুর্ভাব ঘটে তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না। (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৬৩; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৩৮, ১৭৩৯)
একটি হাদীসে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে মানুষের জমায়েত থেকে ফিরে তার আবাসে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উক্ত হাদীসের বিবরণ হলো–
عَنْ عَمْرِو بْنِ الشَّرِيدِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ فِي وَفْدِ ثَقِيفٍ رَجُلٌ مَجْذُومٌ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّا قَدْ بَايَعْنَاكَ فَارْجِعْ
হযরত আমর ইবনে শারীদ স্বীয় পিতা শারীদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, বনী সাক্বীফের প্রতিনিধি দলে একজন ব্যক্তি কুষ্ঠরোগী ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট সংবাদ পাঠিয়ে বললেন–“নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে বাই‘আত করে নিয়েছি। সুতরাং তুমি ফিরে যাও।”
(সহীহু মুসলিম, হাদীস নং ২২৩১)
এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) প্রায় দেড় হাজার বৎসর পূর্বে সংক্রমন প্রতিরোধে বিচ্ছিন্নকরণ (quarantine) ব্যবস্থার নির্দেশনা প্রদান করেন।
মুমিন বিশ্বাস করেন যে, সকল বিষয়ের ন্যায় রোগের ক্ষেত্রেও আল্লাহর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এজন্য সংক্রমনের ভয়ে অস্থির বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
পাশাপাশি যে সব রোগের বিস্তারে সংক্রমন একটি উপায় বলে নিশ্চিত জানা যায় সে সকল রোগের বিস্তার রোধের ও সংক্রমন নিয়ন্ত্রনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
(১২)
===================================
(মহামারির সময় বাড়িতে নামাজ আদায় সংক্রান্ত :)
"হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে হারেছ (রা:) হতে বর্ণিত ৷ তিনি বলেন, এক বর্ষণমুখর দিনে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা:) মুয়ায্যিনকে বললেন: যখন তুমি (আযানে) 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বলবে, তখন 'হাইয়া আলাস্ সালাহ্' বলবে না, বলবে 'সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম' ( তোমরা নিজ নিজ গৃহে নামাজ আদায় কর ) তা লোকেরা অপছন্দ করল ৷ তখন তিনি বললেন: আমার চাইতে উত্তম ব্যক্তি {রাসূল(স:)} তা করেছেন ৷ জুম'আ নিঃসন্দেহে জরুরী ৷ আমি অপছন্দ করি যে, আপনাদেরকে মাঠি ও কাদার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করার অসুবিধায় ফেলি ৷" ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৯০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৯৯)
সুনানু আবি দাউদে আবনে আব্বাস(রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে ৷ তিনি বলেন, রাসূল(স:) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুয়ায্যিনের আযান শুনে বিনা কারণে মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামায়াতে নামায আদায় করবে না, তার অন্যত্রে আদায়কৃত নামায আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না ৷ ( অর্থাৎ, পরিপূর্ণ নামায হিসেবে গণ্য হবে না ৷) সাহাবীরা ওজর (অজুহাত) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূল(স:) বললেন : যদি কেউ ভয়ভীতি ও অসুস্থতার কারণে জামায়াতে উপস্থিত হতে অক্ষম হয় তবে তার জন্য বাড়িতে নামায পড়া দূষণীয় নয় ৷ (সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং-৫৫১)
অত্র হাদীসদ্বয়ে অতিবৃষ্টি, ভয়ভীতি ও অসুস্থতার কারণে মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামাজ পড়ার জন্য বলা হয়েছে ৷ আর বর্তমান করোনাভাইরাস এমন এক মহামারি যার কারণে মানুষের মৃত্যু হতে পারে ৷ সুতরাং এই মহামারির অবস্থায় মসজিদে না গিয়ে সাময়িকভাবে ঘরে নামাজ পড়া অধিকতর যুক্তিসঙ্গত ৷
সহীহ বুখারী শরিফে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল(স:) বলেছেন: যখন বান্দা রোগাক্রান্ত হয় কিংবা সফর করে, তখন তার জন্য তাই লিখিত হয়, যা সে মুকিম অবস্থায় বা সুস্থ অবস্থায় আমল করত ৷ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৯৯৬)
করোনাভাইরাস এক প্রকার ওজর (অজুহাত) ৷ তাই এই ভাইরাস থেকে আত্মরক্ষার্থে মসজিদে জামায়াতে নামায আদায় না করে ঘরে আদায় করলেও একই সাওয়াব পাওয়া যাবে ইনশা'আল্লাহ ৷
(১৩)
===================================
(সরকারি নির্দেশনা ও করণীয় :)
যে কোনো মহামারিতে সরকার কর্তৃক কোনো নির্দেশনা আসলে তা ইসলাম বিরোধী না হলে অবশ্য পালনীয় ৷ কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন—
يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوٓا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِى الْأَمْرِ مِنكُمْ
হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। (সূরা-নিসা:৫৯)
মহামারির ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানিদের দেয়া করণীয় মেনে চলা প্রয়োজন ৷ বিশেষ করে কুরআন আর হাদীস কর্তৃক করণীয় মেনে চলতে হবে এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখতে হবে ৷
(১৪)
==================================
(প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল:)
কেউ কেউ বলছে, 'আরে, আল্লাহ চাইলে মৃত্যু হবেই। এতো চিন্তার কি আছে?' কথা সত্য। কিন্তু, তাওয়াক্কুলের সংজ্ঞাটা এরকম না। এক সাহাবি একবার নবীজীর কাছে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'আগে ঘোড়াটাকে রশি দিয়ে খুঁটিতে বাঁধবে, এরপর তাওয়াক্কুল করবে'।
মানে হলো, আগে সতর্কতার সবকটা স্তর পূরণ করতে হবে। সাথে তাওয়াক্কুল। সতর্ক না হয়ে, 'আরে কিছু হবেনা' টাইপ কথা বলার মধ্যে সঠিক তাওয়াক্কুল নেই।
(*) قُل لَّن يُصِيبَنَآ إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلٰىنَا ۚ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
বল, ‘আমাদেরকে শুধু তা-ই আক্রান্ত করবে যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক, আর আল্লাহর উপরই যেন মুমিনরা তাওয়াক্কুল করে’। (সূরা-তাওবাহ:৫১)
(*) وَأَنفِقُوا فِى سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ۛ وَأَحْسِنُوٓا ۛ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর এবং নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর সুকর্ম কর। নিশ্চয় আল্লাহ সুকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন। (সূরা-বাকারাহ:১৯৫)
*হযরত মুসা(আ:) এর অনুসারীদেরসহ যখন ফেরাউন ধাওয়া করলেন পিছন দিক থেকে, তখন হযরত মুসা(আ:) কিন্তু আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেননি ৷ আল্লাহর আদেশে তিনি লাঠি দ্বারা আঘাত হানলেন; ফলে সাগরে রাস্তার হয়ে যায় ৷ অতচ আল্লাহ চাইলে এমনিতে লাঠির আঘাত ছাড়া সাগরে রাস্তা করে দিতে পারতেন ৷ অতএব তিনি প্রচেষ্টা করার শিক্ষা দিলেন ৷
*হযরত নূহ(আ:) যুগে মহাপ্রলয় হওয়ার সময় তিনি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেননি ৷ তিনি আল্লাহর আদেশে নৌকা তৈরি করলেন ৷ অতচ আল্লাহ চাইলে নৌকা ছাড়াই নূহ(আ:) ও তার সাথীদের মহাপ্রলয় থেকে বাচাতে পারতেন ৷ অতএব, তিনি প্রচেষ্টার শিক্ষা দিলেন ৷
*হযরত মুহাম্মদ(স:) যখন মক্কায় কুরাইশ কর্তৃক নির্যাতিত ও হত্যার হুমকির সম্মুখিন হলেন, তখন তিনি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেননি; বরং, আল্লাহর আদেশে হিজরত করলেন মদিনাতে ৷ অতচ আল্লাহ চাইলে কোনো উপায় ছাড়া রাসূল(স:)কে রক্ষা করতে পারতেন ৷ অতএব, হিজরতের মাধ্যমে প্রচেষ্টা করার শিক্ষা দিলেন ৷
এরপরও যারা 'যা হওয়ার হবে' বলে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেন ৷ তারা একটু ভাবুন, পানিতে সাঁতার না কেটে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে থাকলে কিন্তু আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করবেন না ৷ কেননা আপনার প্রচেষ্টা নাই বলে ৷ গাছের উপর বসে থেকে আল্লাহ খাওয়াই দিবে বলে চুপ থাকলে, তাতে কখনো আপনি খাদ্যের গন্ধ পাবেন না ৷ কেননা আপনার প্রচেষ্টা না থাকলে তিনি রিজিক আপনাকে কেন দিবে?
অতচ, আল্লাহ চাইলে সবকিছু করতে পারেন ৷ কিন্তু তিনি সবাইকে প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম করার শিক্ষা দিয়েছেন ৷ সুতরাং প্রচেষ্টাও করতে হবে এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলও রাখতে হবে ৷ দুটোর সমন্বয়ে আল্লাহ সফলতা দান করেন ৷ অতএব, মহামারির সময় যাবতীয় করণীয় পালনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে ৷
(১৫)
===================================(মহামারিতে প্রচলিত কুসংস্কার:)
মহামারির সময় দেখা যায় অনেক ধরনের সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার যা ইসলামে স্বীকৃত নয় ৷ যেমন: বিভিন্ন ঝাড়পুক ও দোয়ার কাগজ লিখে ছাগল গ্রামের চতুর্দিকে ঘুরিয়ে জবাই করার মাধ্যমে পাড়া বন্ধ (পাড়া বন) করার মত কুসংস্কার সমাজে প্রচলিত আছে যা বড় ধরনের বিদয়াত ও অনৈসলামিক কাজ ৷ এটা ইসলাম সমর্থন করে না এমনকি রাসূল(স:), সাহাবী ও তাবেয়িদের যুগেও এরকম কর্মের প্রমাণ মিলে না ৷ সুতরাং, এককথায় ইসলাম বিরোধী কাজ ও কুসংস্কার ৷
কুরআনে চুল পাওয়া এবং তা খেলে 'করোনার' মত মহামারি রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলেও কুসংস্কার দেখা দিয়েছে ৷
একজোগে সম্মিলিতভাবে আযান দেওয়ার মত কুসংস্কার দেখা দিয়েছে ৷ অতচ, রাসূল(স:)এর যুগে এ ধরনের কোনো আমল পরিলক্ষিত হয়নি ৷
আসলে এই ধরনের কুসংস্কার সৃষ্টির পিছনে কিছু কাঠ মোল্লাহ আর সমাজের কিছু নামধারি দূষিত মুসলিমদের মনগড়া প্রচেষ্টা রয়েছে ৷ বিশেষ করে কাফের-মুশরিকদের মত বাপ-দাদাদের অনৈসলামিক কর্ম অনুসরণে তৎপরতার কারণ ৷
আল্লাহ বলেন—
(*) أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوٓا أَن يَقُولُوٓا ءَامَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? (সূরা-আনকাবুত:০২)
সুতরাং মহামারি একটি আল্লাহর পরীক্ষা ৷ এ সময় ধৈর্য ধরতে হবে ৷ কিন্তু ইসলামে নতুন কিছু সৃষ্টি করা যাবে না ৷ ঈমান এনেছি বলে কিন্তু কুসংস্কার প্রচলন করে জান্নাতে যাওয়া যাবে না ৷ আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তির্ণ হতে হবে ৷
আল্লাহ সবাইকে উপরিল্লিখিত বিষয়াবলি বুঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুক ৷ আমিন ৷
বিস্তারিত পড়ে থাকলে এই বিষয়ে আপনার মতামত জানাবেন ৷ খুশি হব ৷ এটি সম্পন্ন করতে অনেক কষ্ট হয়েছে ৷ "আল্লাহ হাফেজ"-(RSD RASHID)
Comments
Post a Comment