নিয়ন্ত্রিত রাগ সুফল বয়ে আনে

 "নিয়ন্ত্রিত রাগ সুফল বয়ে আনে"


মানুষের রয়েছে রিয়েকশনের কিছু দিক যার মধ্যে রাগ হল অন্যতম ৷ রাগ হল শয়তানের পক্ষ থেকে আসা ভয়ঙ্কর ফাঁদ ৷ যে ফাঁদে অধিকাংশ মানুষই পতিত হয় ৷ ফলে সূচনা হয় নতুন কোনো ট্রাজেডির ইতিহাস ৷ রাগের ভয়ঙ্কর দিক থেকে বেঁচে চলার জন্য আল্লাহ অনুপ্রেরণামূলক আয়াত নাযিল করেছেন এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা উপস্থাপন করেছেন ৷ আল্লাহ বলেন, 'যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে । আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন ৷' (সূরা আল-ইমরান: ১৩৪)
রাগের ফাঁদটি শয়তান বিভিন্ন পরিস্থিতির সামনে উপস্থাপন করে ৷ যার কারণে হত্যাকাণ্ড, গুম, অপহরণ, বিবাহ বিচ্ছেদ ও সম্পর্ক বিচ্ছিন ইত্যাদি সংঘটিত হয় ৷ তুচ্ছ কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে মর্মান্তিক ঘটনার সূচনা হয়ে থাকে অনেক সময় ৷ এমনকি সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে এক বন্ধু একশত টাকার জন্য অপর বন্ধুকে ছুরি দ্বারা আঘাত করে হত্যা করে ৷ এরূপ শতশত ঘটনার জন্ম হচ্ছে প্রতিনিয়ত ৷ মূলত এসবকিছু হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত রাগের ফসল ৷ তাই এরূপ ভয়াবহ অনাকাঙ্কিত ঘটনা এড়াতে রাগ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷ রাসূল(সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যেকোনো হুর নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেওয়ার অধিকার দান করবেন ৷’ (ইবনে মাজাহ: ৪১৮৬)। রাসূল(সা.) আরও বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই ৷’ (ইবনে মাজাহ: ৪১৮৯)
আমাদের অন্তরে শয়তান এমন একটি ভয়ঙ্কর চিন্তা উত্তাপন করে যা সরাসরি কাজ করতে শুরু করে দেই ৷ আর তা হল—'হেরে যাওয়ার ভয় কিংবা নিজেকে ছোট মনে করা' ৷ এই চিন্তাটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে বলেই মূলত এসব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে ৷ কিন্তু তা মুটেও সঠিক নয়; বরং মহা ভ্রান্তি ৷ রাসূল(স:) বলেছেন, ‘সে প্রকৃত বীর নয় যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়; বরং সে-ই প্রকৃত বীর যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয় ৷’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৮৪)
তায়েফের সেই করুণ কাহিনীর কথা স্মরণ করুন যখন রাসূল(স:)-এর উপর নেমে এসেছিল তায়েফবাসীর অমানবিক নির্যাতন ৷ যে দৃশ্যটি দেখে স্বয়ং ফেরশতা পর্যন্ত ক্ষেপে গেলেন তায়েফবাসীর উপর ৷ অতঃপর, রাসূল(স:)-এর নিকট ফেরেশতা তায়েফের দু'পাশের পাহাড় এক করে দিয়ে তায়েফবাসীকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন ৷ কিন্তু দয়াল নবী(সা:)-এর উত্তর ছিল, ‘ (না, তা হতে পারে না); বরং আমি আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশে এমন সন্তান দেবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে শরিক করবে না ৷’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৫৪) উক্ত ঘটনায় রাসূল(স:) রাগের পরিবর্তে পুরো তায়েফবাসীকে ক্ষমা করে দিলেন ৷ পরবর্তীতে ক্ষমার বরকতে আজ পুরো তায়েফবাসী দ্বীনের মধ্যে শামিল হয়ে গেলেন ৷ এটাই হল রাগ নিয়ন্ত্রণ আর ক্ষমার দৃষ্টান্ত ৷
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, ‘অতএব, তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগমাত্র ৷ আর আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী, তাদের জন্য যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের পালনকর্তার ওপর ভরসা করে ৷ যারা বড় গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হয়েও ক্ষমা করে ৷’ (সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ৩৬-৩৭)
রাগ নিয়ন্ত্রনের জন্য কিছু কৈশল বা পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারলে অবশ্যই এর সুফল মিলবে অনায়াসে ৷ যেমন: রাগ আসার উপক্রম হলে প্রথমে নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া, ধৈর্য ধরা, বসে পড়া আর বেশি হলে মাটিতে শুয়ে পড়া এবং আল্লাহর কাছে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আশ্রয় চাওয়া ৷ যদি সম্ভব হয়, তাহলে স্থান ত্যাগ করা ভালো ৷
নবী করিম(সা.) বলেন, ‘আমি এমন একটি কালেমা জানি, যা পাঠ করলে ক্রোধ দূর হয়ে যায়। (আর তা হলো) “আউযু বিল্লাহি মিনাশ্ শাইত্বনির রাজিম” অর্থাৎ, আমি বিতাড়িত শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৩১৭)

অতএব, নিজেদের এবং অপরের কল্যাণে যেন সর্বদা রাগ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট থাকি ৷ আল্লাহ তায়ালা আমাদের তৌফিক দান করুন ৷ আমিন!

লেখক: আবদুর রশীদ
প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Comments