"ঋণগ্রস্ত হওয়ার কারণ ও প্রতিকার"
বর্তমান প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে ছোট-বড় ঋণের কবলে পতিত ৷ আসলে ঋণের মাত্রা এতই তীব্র ভয়াবহ হওয়ার পিছনে রয়েছে অনেক কারণ ৷ সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—
(১) সামর্থ্যের গণ্ডি অতিক্রম করা ৷ গায়ে ভাষায় বলতে গেলে, "মশারির বাইরে হাত টানা" বোঝায় ৷ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত হওয়ার এটিই বড় কারণ ৷ অর্থাৎ, যার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, ততটুকু গণ্ডির মধ্যে না থেকে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে পা রাখাই আজ ঋণগ্রস্ত হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ যেমন- ব্যক্তির মাসিক আয় বিশ হাজার টাকা এবং মাস শেষে সঞ্চয়ের পরিমাণ ৫-৭ হাজার টাকা যদি হয়, তাহলে তার পক্ষে কখনো একটা ২ তলা বিংল্ডিং করা সম্ভব নয় ৷ এমন ক্ষেত্রে যদি ওই ব্যক্তি বিল্ডিংয়ের পরিকল্পনা করে তাহলে তো ঋণের বোঝা বইতে হবে ৷ এইভাবে সবাই ছোট-বড় ঋণে জড়িত অনর্থ চাহিদার ফলে ৷ ব্যবসা সমৃদ্ধ করতে, কোম্পানী ডেভেলাপ করতে এবং আয়ের সোর্স বাড়াতে সবাই সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ব্যাংকিং সিস্টেম সুদ এবং ধারকৃত সুদের সাথে জড়িত যা ঋণগ্রস্ত হওয়ার আসল প্রাণকেন্দ্র ৷
(২) ব্যাংকের লোভী অফার গ্রহণ ৷ অর্থাৎ, বিভিন্ন ইনস্যুরেন্স ও ব্যাংক লিমিটেডের পক্ষ থেকে বেশি ঋনে অল্প সুদ পরিশোধযোগ্য অফার ৷ যেমন- ৫০ হাজারে মাত্র ২-৪ হাজার টাকা সুদ দিতে হবে ৷ ১ লাখে ৭-৮ হাজার সুদ দিতে হবে ৷ তাই এমন অফারে লোভী হয়ে ঝাপ দেওয়ার ফলে আজ অধিকাংশই ঋণগ্রস্থ ৷ এটা এই জন্যই ঋণ বলা হচ্ছে কেননা এর ফলে প্রতি সপ্তাহে কিংবা মাসে একটি নির্দিষ্ট এমাউন্ট বাধ্যতামূলক পরিশোধ করতে হচ্ছে যা ব্যাক্তি মালিকানায় টাকা থাকুক আর না থাকুক ৷
(৩) দারিদ্রতা হল ঋণগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ ৷ দারিদ্রতার দরুন সুদযুক্ত টাকা ধার করতে বাধ্য হচ্ছে এবং ব্যাংক থেকে সুদের উপর ঋণ নিতে হচ্ছে দরিদ্র জনদের ৷ ফলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে ৷
(৪) অকল্পনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ ৷ ব্যক্তির যতটুকু আয় তার চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি ৷ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়(বেতন) বাড়ছে না চাকরিজীবীর ৷ ফলে পাঁচ টাকার স্থলে দশ টাকা খরছ হচ্ছে ৷ অথচ, পাঁচ টাকা আয়ের(বেতন) স্থলে দশ টাকা আয়ের স্কেল বাড়ছে না ৷ যার কারণে ঋণের মধ্যে পা রাখতে হচ্ছে ৷ অপরদিকে কৃষিজীবীদের আরো শোচনীয় অবস্থা ৷
(৫) সরকার কর্তৃক উপযুক্ত অব্যবস্থাপনা ৷ অর্থাৎ, ঋণগ্রস্ততা দূর করতে সরকার চাহিদা অনুযায়ী গড়ে তুলছে না বিভিন্ন কর্মসংস্থান ৷ তেমন সুযোগসুবিধাও দিচ্ছে না দরিদ্র জনদের ৷ দারিদ্রতা দূর করতে বিভিন্ন কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত অপরিহার্য ৷ অথচ, দেশের লোকসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী নেই কোনো কর্মসংস্থান এবং নেই কোনো সুযোগসুবিধা ৷ দরিদ্রদের জন্য কিছু সরকারি অনুদান পাশ হলেও তা দরিদ্রদের হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বড়-বড় দাদাদের পেঠে হজম হয়ে যাচ্ছে ৷ ফলশ্রুতিতে ঋণের প্রভাব বেড়ে চলছে ৷
(৬) যথার্থ যাকাত অনাদায় ৷ প্রকৃতপক্ষে ধনীরা যদি সঠিকভাবে জাকাত প্রদান করত, তাহলে ঋণগ্রস্ত হওয়ার দূরের কথা দারিদ্রতা পর্যন্ত দূর হয়ে যেত ৷ অসহায় মানুষদের ঋনের পিছনে ছুটতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত ৷ ঋণ প্রতিকারের ক্ষেত্রে জাকাতেরও একটি ভূমিকা রয়েছে ৷
(৭) যৌতুক প্রথার ভয়াবহতা ৷ যৌতুক প্রথা সমাজে এক বড় মহামারি ৷ একজন কন্যা সন্তানের পিতা ঋণের বোঝা বয়ে যাচ্ছে এই মহামারির কারণে ৷ এটা ঋণগ্রস্ত হওয়ার একটি অংশ ৷
ঋণগ্রস্ততার প্রতিকার:
১. সাধ্যের মধ্যে চাহিদাগুলো সীমাবদ্ধ রাখা ৷
২. যথাসম্ভব ব্যাংক লোন থেকে বিরত থাকা ৷
৩. দারিদ্রতা দূর করতে বিভিন্ন কর্মসংস্থান গড়ে তোলার পাশাপাশি সুদমুক্ত কর্জে হাসানা ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা ৷
৪. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখে চাকরিজীবীদের উপযুক্ত বেতন স্কেল নির্ধারণ করা যাতে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়ের ঘাটতি কমে আসে ৷
৫. সঠিকভাবে উপযুক্ত ব্যক্তিদের জাকাত প্রধান করা যাতে ঋনের কবল এবং দারিদ্রতা থেকে ফিরে আসতে সক্ষম হয় ৷
৬. পারস্পরিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা ৷
৭. সামাজিকতায় যৌতুক প্রথার মতো নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ডগুলো দূর করা ৷
আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের সবাইকে ঋণের কবল থেকে বের হওয়ার তৌফিক দান করুন ৷ আমিন!
লেখক: আবদুর রশীদ
Comments
Post a Comment