"রবের ভালোবাসা"
পুরো সৃষ্টি জগৎ যেন ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ৷ বাস্তবিকভাবে যদি পুরো বিশ্বের দিকে লক্ষ্য করি, বাহ্যিকভাবে অপরাধ প্রবণতা চোখে পড়লেও সবচেয়ে ভালোবাসার পরিমাণ বেশি নিহিত ৷ প্রতিটি প্রাণীর মাঝে ভালোবাসা রয়েছে বৈচিত্রে পরিপূর্ণ ৷ ভালোবাসার কারণেই কত হৃদয় বিদারক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই যাচ্ছে এবং কত কাহিনী ইতিহাস হয়ে রয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই ৷ অথচ, এই সামান্য সৃষ্টির এত ভালোবাসা হলে, সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা কেমন হবে তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে!
রাসূল (স.) বলেছেন, আল্লাহ তা'য়ালা রহমতকে (ভালোবাসা) একশ ভাগ করেছেন । তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ তিঁনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন । আর পৃথিবীতে একভাগ অবতীর্ণ করেছেন । ঐ এক ভাগের কারণেই সৃষ্টজগৎ একে অন্যের উপর দয়া করে । এমনকি জন্তু তার বাচ্চার উপর থেকে পা তুলে নেয় এই ভয়ে যে, সে ব্যথা পাবে । (সহিহ বুখারী: ৬০০০, সহিহ মুসলিম: ৭১৪৮-৭১৫১)
উপরোক্ত হাদিস থেকেই উপলব্ধি করা যায় যে, রবের ভালোবাসা কতটুকু ! তিনি বান্দাহকে শুধু ক্ষমা করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন ৷ কোনো একটি উছিলায় তিঁনি আমাদের ক্ষমা করে দেন ৷ তিঁনি কত না গোনাহ মোচনের পথ খোলা রেখেছেন কেবল বান্দাহকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতের পথের পথিক বানাতে ৷ যদি আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে রবের ভালোবাসা অনুসন্ধান করি, তবে কেবল রবের ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই চোখে ধর্ণা দিবে না ৷ কত অপরাধ রাত এবং দিনে অন্যের অজান্তে করে থাকি, তবে রবের কাছে তা সুস্পষ্ট ৷ আল্লাহ তা'য়ালা যদি চাইতেন, তাহলে ওই অপরাধসমূহ ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার সময় কপালে লিখে প্রকাশ করে দিতে পারতেন ৷ কিন্তু, তিনি তা করেন না ৷ এটা আমাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ৷ শুধু কি এতে সীমাবদ্ধ? তিঁনি আরো বলেছেন, নিজেদের অপরাধ যেন অন্যের কাছে প্রকাশ না করি ৷ আল্লাহ গোপন রেখেছেন এবং নিজেকেও গোপন রাখার আদেশ দিয়েছেন ৷ তিঁনি বান্দাদের কতই না ভালোবাসেন! বান্দাদের পাপসমূহও গোপন রেখে দেন ৷ সুবহান'আল্লাহ!
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমার সব উম্মতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারী এর ব্যতিক্রম । আর নিশ্চয়ই এটা বড়ই অন্যায় যে, কোনো লোক রাতের বেলা অপরাধ করল, যা আল্লাহ গোপন রেখেছেন । কিন্তু সে সকালে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক, আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি ৷ অথচ, সে এমন অবস্থায় রাত কাটাল যে, আল্লাহ তার কর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার ওপর আল্লাহর দেওয়া আবরণ খুলে ফেলল ।’ (সহিহ বুখারি : ৬০৬৯)
সাফওয়ান ইবনে মুহরিজ (রহ.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইবনে উমার (রা.)-কে জিজ্ঞেস করল, আপনি নাজওয়ার (কিয়ামতের দিন আল্লাহ ও তাঁর মু'মিন বান্দার মধ্যে গোপন আলোচনা) ব্যাপারে রাসূল (সা.)-কে কী বলতে শুনেছেন? তিনি বলেছেন, তোমাদের এক ব্যক্তি তার প্রতিপালকের এত কাছাকাছি হবে যে তিনি তার ওপর তাঁর নিজস্ব আবরণ টেনে দিয়ে দু'বার জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এই এই কাজ করেছিলে? সে বলবে, হ্যাঁ । আবার তিঁনি জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এই এই কাজ করেছিলে? সে বলবে, হ্যাঁ । এভাবে তিঁনি তার স্বীকারোক্তি গ্রহণ করবেন । এরপর বলবেন, আমি দুনিয়াতে তোমার এগুলো লুকিয়ে রেখেছিলাম । আজ আমি তোমার এসব গুনাহ ক্ষমা করে দিলাম ।' (সহিহ বুখারি : ৬০৭০)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের জাহান্নামের পথ থেকে বাঁচার জন্য হেদায়াতের বাণী প্রেরণ করেন শ্রেষ্ট নবী হযরত মুহাম্মদ(স:)-এর মাধ্যমে যেন আমরা হেদায়াতের আলো খোঁজে পায় ৷ আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, 'রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে ।' (সূরা বাকারাহ: ১৮৫) এটা সবচেয়ে বান্দার প্রতি মহান রবের অনন্য ভালোবাসা ৷ যদি তিঁনি এই পবিত্র গ্রন্থখানি নাযিল না করতেন, তবে আমরা নির্ঘাত পথভ্রষ্ট থেকে যেতাম ৷
বান্দাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে মহান রব প্রতি রাতেই প্রথম আসমানে আগমন করেন ৷ অর্থাৎ, আগমন বলতে আল্লাহর বিশেষ রহমত নাযিল হয় ৷ অতঃপর, গোনাহ মাফের আহ্বান জানাতে থাকেন ৷ হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তা'য়ালা আহ্বান করে বলতে থাকেন— 'যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব । যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব । যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব ।’ (সহিহ বুখারী: ১১৪৫, সহিহ মুসলিম: ৭৫৮)
মহান আল্লাহ তা'য়ালার কাছে শুধু একনিষ্ঠ নিয়তে যদি একবার তাওবা করা হয়, তাহলে বান্দাহর যত জঘন্য আর ছোট-বড় পাপ রয়েছে সবগুলোই মুহূর্তের মধ্যে মিটিয়ে দেন এবং বান্দাহর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন ৷ কতই না মহান তিঁনি! অসংখ্য পাপের স্তুপকেও একটি আন্তরিক দু'য়াই ক্ষমা করে দেন ৷ সুবহান'আল্লাহ ! মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে । যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে । (সূরা বাকারা: ১৮৬)
অন্য আয়াতে বলেন, 'আর আমি বান্দাহর গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী ।' (সূরা-ক্বাফ : ১৬)
প্রিতিটি মুহূর্তে মহান রব বান্দাহর দু'য়া কবুল করে থাকেন ৷ তবে ফলাফল হয়তো তিঁনি উপযুক্ত সময়ে দান করেন ৷ এরপরও মহান রব বিশেষ কিছু মুহূর্ত রেখেছেন যাতে রয়েছে দু'য়া কবুলের নিশ্চয়তা অত্যধিক এবং তা কুরআন ও হাদিস থেকে স্কলারগণ উদ্ঘাটন করেছেন ৷ যেমন- ১. আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়, ২. রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, ৩. সেজদাহর সময়, ৪. ফরজ নামাজের পর, ৫. আরাফাতের দিন, ৬. জিলহজ্জ্ব মাসের প্রথম ১০ দিন, ৭. ইফতারের সময়, ৮. কুরআন পাঠে ক্রন্দনরত অবস্থায়, ৮. জুমার দিন একটি বিশেষ মূহূর্তে, ৯. লাইলাতুল কদরের রাত্রে, ১০. বায়তুল্লাহ তাওয়াফের সময়, ১১. হাজরে আসওয়াদে ইত্যাদি ৷ এই মুহূর্তগুলো হচ্ছে বান্দার জন্য বিশেষ ভালোবাসার প্রতীক ৷
এতদসত্তেও, তিঁনি পুরো একটি মাসকে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যা রমজান মাস হিসেবে প্রসিদ্ধ ৷ নিজেদের পাপ থেকে পবিত্রতা অর্জন এবং আলোর দিকে পরিবর্তনের একটি মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ ৷ এই মাসে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বান্দাহর আমলগুলোর সাওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করে থাকেন এবং বেশি বেশি ক্ষমা করতে থাকেন ৷ অতএব, এই মাস হলো বান্দাহর জন্য সেরা একটি সুযোগ ও উপহার ৷ মহান রবের ভালোবাসা কতই না মহান! এছাড়াও উক্ত মাসে রেখেছেন এক মহিমান্বিত রজনী যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম ৷ আর সেই রজনী হচ্ছে লাইলাতুল কদর ৷ রাসূল (স:) রমজানের শেষ দশকে এই মহিমান্বিত রজনীকে অনুসন্ধান করতে বলেছেন যেন নিজেদের পাপসমূহকে মুছে ফেলতে পারি ৷ মহান আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে এটা বান্দার জন্য সবচেয়ে সেরা একটি উপহার!
তাছাড়া প্রতি সপ্তাহের মধ্যে একটি অন্যতম ফজিলতপূর্ণ দিন হলো জুম'আর দিন ৷ এই দিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিকমাত লুকায়িত আছে ৷ এই দিনে বেশি দু'য়া কবুল হয়ে থাকে এবং কবরবাসীদের শাস্তিও লাগব করা হয় ৷ তাই এই দিনকে বান্দাহ গোনাহ মাপের আরো বিশেষ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে ৷
তিঁনি এর বাইরেও রেখেছেন হজ্জের একটি সুযোগ ৷ সামর্থ্যবান ব্যক্তি হজ্জের মাধ্যমে নিজের পাপসমূহকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলে নিস্পাপ হতে পারে ৷ এছাড়াও মহান আল্লাহ তা'য়ালা রেখেছেন আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ৷ যেমন- দান-সদাকার মাধ্যমে আল্লাহর রাগ কমে যায়, যার ফলাফল আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হওয়া যায় ৷ রয়েছে আরো উত্তম আচরণ, সহযোগিতা, সহানুভূতি ইত্যাদি অসংখ্য আমলের দ্বারা মহান আল্লাহ তা'য়ালা বান্দাহর গোনাহ ক্ষমা করে থাকেন ৷ মহান রবের ভালোবাসার তুল্য কোনো কিছুই নেই ৷ সবকিছু তাঁর ভালোবাসা ও শক্তির অধীনে ৷ অতএব, আসুন না নিজেদের রবকে এবং নিজেদের আত্মাকে চেনার চেষ্টা করি ৷ আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের সবাইকে যেন সবসময় তাঁর ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে রাখেন ৷ আমিন!
লেখক: আবদুর রশীদ
Comments
Post a Comment