অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল তিনিই রাখেন

 "অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল তিনিই রাখেন"


ইসলামের প্রথম স্তম্ভ হলো ঈমান ৷ ঈমান হচ্ছে মাথার সমতুল্য ৷ মাথা ব্যতিত দেহের যেমন কোনো মূল্য থাকে না তেমনি ঈমান ছাড়া যাবতীয় ইবাদত মূল্যহীন ৷ তাই, একজন প্রকৃত মুসলিম দাবিতে আল্লাহ তা'য়ালার একত্ববাদে যেরূপ এখনিষ্ঠভাবে ঈমানের ঘোষণা দেওয়া অপরিহার্য তেমনি তাঁর একক গুণের প্রতিও ঈমান রাখা অপরিহার্য ৷ মহান আল্লাহ তা'য়ালার অসীম কুদরত এবং ক্ষমতার একক গুণের মধ্যে অন্যতম হলো "গাইয়ে বা অদৃশ্যের জ্ঞান" আর তা একমাত্র তিনিই অবগত ৷ কোনো সৃষ্টিকুল অদৃশ্য বিষয়ে অবগত হওয়ার ক্ষমতা রাখে না ৷ এই ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালার ৷

আমার কিছু দ্বীনি ভাই মহান আল্লাহ তা'য়ালার এই বিশেষ ক্ষমতা কোনো আউলিয়া কিংবা পীর-বুজুর্গের নিকট বিদ্যমান মনে করে থাকেন (নাউজুবিল্লাহ) ৷ এমনকি এই বিশেষ ক্ষমতা আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ(স:)-কে পর্যন্ত দান করেন নি ৷ আবার কিছু দ্বীনি ভাই এই বিশেষ গুণের উপর রাসূল(স:) ক্ষমতা রাখেন বলে তাঁর ওপর সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যা আরোপ করে থাকে নিজেদের অজান্তেই ৷ এমনটা বললে রাসূল(স:)-কে সম্মানের উচ্চ আসনে সমাসীন করা হয় না; বরং তাঁর প্রতি অপবাদ লেপন করা হয় ৷

প্রিয় ভাই, রাসূল(স:)-কে ভালোবাসার অর্থ হলো তাঁর আনিত বিধানকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করা ৷ যখন তা সঠিকভাবে মেনে চলবেন তখনই রাসূল(স:)-কে ভালোবাসা প্রকাশ পাবে ৷ এছাড়া রাসূল(স:)-কে ভালোবাসার নামে অনুসরণ বাদ দিয়ে নিজস্ব মনগড়া নিয়মনীতি আর আচরণ কখনো আল্লাহর রাসূল(স:)-কে শ্রদ্ধার মানদণ্ডে রেখে ভালোবাসা সম্ভব নয় ৷

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে না ৷ আমার কিছু দ্বীনি ভাইয়েরা কেন এত স্বচ্চ কাছের মত আল্লাহর ঘোষনাকে তোয়াক্কা না করে নিজেদের মনগড়া ভ্রান্ত মতবাদে ডুবন্ত?

পবিত্র মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সুদীর্ঘ ২৩ বছর যাবত রাসূল(স:)-এর ওপর হযরত জিবরাঈল(আ:)-এর মাধ্যমে ওহী করে পাঠানো এই গ্রন্থ শুধু দেখে দেখে রিডিং পড়ার জন্য নাযিল করা হয়নি; বরং এটি একটি জীবন বিধান হিসেবে নাযিল করেছেন যার প্রতিটি বিষয় বুঝা এবং নিজ জীবনের চরিত্রে তা প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক ৷

তাই, পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা'য়ালা গায়েব কিংবা অদৃশ্যের জ্ঞান ও আগাম বার্তা জ্ঞাত সম্পর্কে তথ্য পরিবেশন করেছেন ৷ অতএব, আমাদের উচিত সে তথ্যগুলো সম্পর্কে জানা এবং সে বিষয়ে সচেতনতার সহিত নিজেদের ঈমান নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষার্তে প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকা ৷

আসুন নিম্নোক্ত কয়টি আয়াত ও হাদীসের উপর চোখ বোলায় এবং আয়াতগুলোর অর্থ ভুল বুঝে থাকলে তাফসির দেখে সত্যতা জানার চেষ্টা করি ৷

*স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন:

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন—
আর তাঁর কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না এবং তিনি অবগত রয়েছেন স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে । আর কোন পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন এবং যমীনের অন্ধকারে কোন দানা পড়ে না, না কোন ভেজা এবং না কোন শুষ্ক কিছু; কিন্তু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে । (সূরা: আনআম, আয়াত: ৫৯)

নিশ্চয় আল্লাহর নিকট কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে । আর তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জরায়ূতে যা আছে, তা তিনি জানেন । আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে সে মারা যাবে । নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত । (সূরা: লুকমান, আয়াত: ৩৪)

তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না । (সূরা: জ্বিন, আয়াত: ২৬)

লক্ষ্য করুন, যখন পরিবারের কর্তা(পিতা-মাথা) আদেশ করেন এবং ঐ আদেশ কিংবা হুকুম দ্বীনের বিরুদ্ধে না যায় তখন তা পালন করা আবশ্যক হয়ে পড়ে ৷ এমনকি আমরা তা অবশ্যই মেনে চলে থাকি ৷ আর যখন শিক্ষক কোনো বিষয়ে আদেশ করেন তখনও আমরা তা পালনে করতে বাধ্য থাকি ৷ এখন যিনি আমাদের আদেশ দিচ্ছেন তিনি কিন্তু সাধারণ কেউ নন; বরং বিশ্বজগতের প্রতিপালক যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা যার মুঠোই সব ক্ষমতার আধার ৷ তিনিই আদেশ দিচ্ছেন যে, অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল তারই নিকট অবহিত এবং তা সমস্ত সৃষ্টিকে মেনে নেওয়াও বাধ্যতামূলক ৷ যদি তাঁর আদেশের অবাধ্য হয়ে তাঁর স্বতন্ত্র গুণ নিয়ে তাঁরই সাথে তাঁর সৃষ্টিকে শরিক করেন, তাহলে সাথে সাথে দ্বীন থেকে খারিজ হয়ে মুর্তাদ পরিচয় ধারন করবেন এবং তাওবা ছাড়া আপনার আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না ৷ চলুন, নিম্নোক্ত পয়েন্ট থেকে আরেকটু ভালো জানার চেষ্টা করি ৷

*রাসূল(স:)-এর মাধ্যমে আমাদের প্রতি শিক্ষার বার্তা:

রাসূল(স:)-কে অবহিত করার মধ্য দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন ৷ আল্লাহ বলেন—
বল, ‘আমি আমার নিজের কোন উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান । আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করত না । আমিতো একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা এমন কওমের জন্য, যারা বিশ্বাস করে’ । (সূরা: আরাফ, আয়াত: ১৮৮)

বল, ‘তোমাদেরকে আমি বলি না, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডারসমূহ রয়েছে এবং আমি গায়েব জানি না এবং তোমাদেরকে বলি না, নিশ্চয় আমি ফেরেশতা । আমি কেবল তাই অনুসরণ করি যা আমার কাছে ওহী প্রেরণ করা হয়’ । বল, ‘অন্ধ আর চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? অতএব তোমরা কি চিন্তা করবে না’ ? (সূরা: আন’আম, আয়াত: ৫০)

‘আর আমি তোমাদের বলছি না যে, ‘আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডারসমূহ আছে’ এবং আমি গায়েব জানি না আর আমি এও বলছি না যে, ‘আমি ফেরেশতা’ । তোমাদের চোখে যারা হীন, তাদের সম্পর্কে আমি বলছি না যে, ‘আল্লাহ তাদেরকে কখনো কোন কল্যাণ দান করবেন না’ । তাদের অন্তরে যা আছে, সে সম্পর্কে আল্লাহ অধিক অবগত । (যদি এরূপ উক্তি করি) তাহলে নিশ্চয় আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হব’ । (সূরা: হুদ, আয়াত: ৩১)

বল, ‘আমি রাসূলদের মধ্যে নতুন নই । আর আমি জানি না আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে । আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। আর আমি একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র’ । (সূরা: আল-আহকাফ, আয়াত: ৯)

আসমানসমূহ ও যমীনের গায়েব আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে । সুতরাং তুমি তাঁর ইবাদাত কর এবং তাঁর উপর তাওয়াক্কুল কর । আর তোমরা যা কিছু কর সে ব্যাপারে তোমার রব গাফেল নন । (সূরা: হুদ, আয়াত: ১২৩)

তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে, ‘তা কখন ঘটবে’ ? তুমি বল, ‘এর জ্ঞান তো রয়েছে আমার রবের নিকট । তিনিই এর নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন । আসমানসমূহ ও যমীনের উপর তা (কিয়ামত) কঠিন হবে । তা তোমাদের নিকট হঠাৎ এসে পড়বে । তারা তোমাকে প্রশ্ন করছে যেন তুমি এ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত । বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকট আছে । কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’ । (সূরা: আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৮৭)

লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে ৷ বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকটই আছে, আর তোমার কি জানা আছে, কিয়ামত হয়ত খুব নিকটে! (সূরা: আল-আহযাব, আয়াত: ৬৩)

বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না । আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’ । (সূরা: নামল, আয়াত: ৬৫)

কতই না স্বচ্ছ আয়াতসমূহ ! কতই না সুন্দর বর্ণনা !
যদি আমরা না বুঝি কিংবা বুঝেও গোমরাহিতে ডুবে থাকি, তাহলে আমাদের মত হতবাগা আর কিইবা থাকতে পারে আকাশের নিচে ও জমিনের উপরে !


*স্বয়ং রাসূল(স:) সাক্ষি দিচ্ছেন এবং তাঁর সত্যতা আল্লাহ তা'য়ালা তুলে ধরেছেন:

নিম্নোক্ত আয়াতগুলো মনযোগের সাথে লক্ষ্য করুন এবং গভীরভাবে চিন্তা করুন:-

আর যখন নবী তার এক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন; অতঃপর যখন সে (স্ত্রী) অন্যকে তা জানিয়ে দিল এবং আল্লাহ তার (নবীর) কাছে এটি প্রকাশ করে দিলেন, তখন নবী কিছুটা তার স্ত্রীকে অবহিত করল আর কিছু এড়িয়ে গেল । যখন সে তাকে বিষয়টি জানাল তখন সে বলল, ‘আপনাকে এ সংবাদ কে দিল?’ সে বলল, ‘মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন ।’ (সূরা: আত-তাহরীম, আয়াত: ৩)

আর তোমাদের আশপাশের মরুবাসীদের মধ্যে কিছু লোক মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কিছু লোক অতিমাত্রায় মুনাফিকীতে লিপ্ত আছে । তুমি তাদেরকে জান না । আমি তাদেরকে জানি । অচিরে আমি তাদেরকে দু’বার আযাব দেব তারপর তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে মহা আযাবের দিকে । (সূরা: আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০১)


*স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালাই অবহিত করেন:

মহান আল্লাহ তা'য়ালা নিজ ইচ্ছাতে যখন কোনো কিছু মানুষদের জানানোর ইচ্ছা পোষন করেন তখন অবহিত করে থাকেন ৷ যেমন আল্লাহ বলেন—

আল্লাহ! তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই । তিনি স্বাধীন ও নিত্য নতুন ধারক, সব কিছুর ধারক । তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করেনা । নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর । কে আছে এমন, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করতে পারে? সম্মুখের অথবা পশ্চাতের সবই তিনি অবগত আছেন । একমাত্র তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত, তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারেনা । তাঁর আসন আসমান ও যমীন ব্যাপী হয়ে আছে এবং এতদুভয়ের সংরক্ষণে তাঁকে বিব্রত হতে হয় না । তিনিই সর্বোচ্চ, মহীয়ান । (আয়াতুল কুরসী) (সূরা: আল বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫)


*স্বয়ং আল্লাহর প্রতিই মিথ্যা আরোপ:

রাসূল(স:)-কে গায়েবের বিষয়ে জ্ঞাত মনে করা স্বয়ং আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করার শামিল ৷ কেননা তিনি ব্যতিত তা আর কেউ অবগত নয় ৷ এই বিষয়ে হযরত আয়েশা(রা:) হতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যার থেকে স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে, গায়েবের ক্ষমতা কেবল মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'য়ালার ৷

হাদিসটি নিম্নরূপ—
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যাক্তি দাবী করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগামী কাল কি হবে তা জানেন, সে আল্লাহ্‌র প্রতি মহা মিথ্যা আরোপ করে । কারণ আল্লাহ্‌ তো বলেন, হে নবী! আপনি বলে দিন আল্লাহ্‌ ছাড়া আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসীদের মধ্যে আর কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না ।” [বুখারীঃ ৩০৬২, মুসলিমঃ ২৮৭, মুসনাদে আহমাদঃ ৬/৪৯]


*সাধারণত গায়েবের চাবিকাটি ৫ টি:

ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত । তিনি বলেছেনঃ গায়েবের চাবিকাঠি পাঁচটি, যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই জানে না । মাতৃগর্ভে কি গুপ্ত রয়েছে তা জানেন একমাত্র আল্লাহ এবং আগামীকাল কি সংঘটিত হবে তাও জানেন একমাত্র আল্লাহ এবং বৃষ্টিপাত কখন হবে তাও একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই জানে না এবং কে কোন ভূমিতে মারা যাবে তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই জানে না এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই জানে না কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে । [সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত, হাদিস নং ৬৮৭৫]


*রাসূল(স:) গায়েবের বিষয়ে অবগত না হওয়ার যৌক্তিক ঘটনাবলি:

বহু বিষয় রয়েছে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়ত্ত করতে চেয়েছেন, কিন্তু তা করতে পারেননি । তাছাড়া বহু দুঃখ-কষ্টও রয়েছে যা থেকে আত্মরক্ষার জন্য তিনি ইচ্ছা করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাতে পতিত হতে হয়েছে ।

আয়িশা (রাঃ) এর প্রতি মিথ্যা অপবাদের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রাসূল (সাঃ) গায়েবের খবর জানতেন না । যদি গায়েবের খবর জানতেন তাহলে যখন আয়িশা (রাঃ) এর উপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল তখনই তিনি বলে দিতেন যে, এটি মিথ্যা অপবাদ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না । কিন্তু তিনি কিছুই বলতে পারেন নি; বরং ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর মিথ্যা অপবাদের অবসান ঘটেছে । [ফাতহুল বারী, ৮/৫৭৪, হাদিস নং ৪৭৫০]

রাসূল(স:) ব্ল্যাক ম্যাজিক-এ আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ ছয় মাস অসুস্থ ছিলেন ৷ অতচ তিনি অগ্রিম অবগত থাকলে এই কালো যাদু থেকে রক্ষা পেতে পারতেন ৷ পরবর্তীতে আল্লাহ সূরা ফালাক আর নাস নাযিলের মাধ্যমে জানিয়ে দেন ও রোগ থেকে মুক্তি পান ৷

হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম বেঁধে সাহাবায়ে কেরামের সাথে উমরা করার উদ্দেশ্যে হারাম শরীফের সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে যান ৷ কিন্তু, হারাম শরীফে প্রবেশ কিংবা উমরা করা তখনো সম্ভব হয় নি; সবাইকে ইহরাম খুলে ফিরে আসতে হয়েছে । যদি ফিরে আসতে হবে তা অগ্রিম জানতেন তাহলে হয়তো অন্য কোনো উপায় বেঁচে নিতেন ৷

তেমনিভাবে ওহুদ যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হন এবং মুসলিমদেরকে সাময়িক পরাজয় বরণ করতে হয় । এমনি আরো বহু অতি প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সংঘটিত হয়েছে ।

এ সবগুলো থেকেই প্রমাণিত যে, তিনি গায়েবের জ্ঞান রাখেন না । মনে রাখতে হবে যে, যখন রাসূল(স:) অগ্রিম কিছু বলতেন তা আল্লাহ তা'য়ালা পূর্বেই অহির মাধ্যমে জানিয়ে দিতেন ৷ এর কারণেই তিনি আগাম অনেক কিছু বলতে সক্ষম ছিলেন ৷

"রাসূল(স:) গায়েব জানে না" এমন বলার অর্থ এই নয় যে, তাঁর প্রতি কটুক্তিমূলক অপভাষা ব্যবহার করা; বরং তাঁকে জঘণ্য অপবাদ দেওয়া থেকে বিরত থাকা ৷

রাসূল(স:) নিজ থেকে কিছুই বানিয়ে বলতেন না ৷ এমনটি সাক্ষস্বরূপ মহান আল্লাহ তা'আলা নিজেই মন্তব্য পেশ করেছেন—

আর সে মনগড়া কথা বলে না । তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরণ করা হয় । (সূরা: নাজম, আয়াত: ৩-৪)

অতএব আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে যে, তিনি শুধু ততটুকুই জানেন, যতটুকু আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন । আর আল্লাহ তাঁদেরকে(নবীদের) জানিয়ে দেওয়ার পর সেই অবগত বিষয়কে আর গায়েবের জ্ঞান বলা যাবে না ।


*কিছু বিষয়ে অজ্ঞতাবশত মতানৈক্য:

আমার কিছু মুসলিম ভায়েরা যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে অনেক দলিল পেশ করে থাকেন ৷ এর মধ্যে অন্যতম একটি দলিল হলো নিম্নোক্ত হাদীসটি—

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত ৷ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন । তিনি বললেন, এ দুই কবরবাসীকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, কিন্তু কোন বিরাট গুনাহের জন্য শাস্তি দেয়া হচ্ছে না । এদের একজন প্রস্রাব করার সময় আড়াল করতো না । সহীহ মুসলিমের আর এক বর্ণনায় আছে, প্রস্রাব করার পর উত্তমভাবে পাক-পবিত্রতা অর্জন করতো না । আর অপরজন একজনের কথা অন্যজনের কানে লাগাতো (চোগলখোরী করতো) । এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খেজুরের একটি তাজা ডাল ভেঙ্গে তা দুই ভাগ করলেন এবং প্রত্যেক কবরে তার একটি অংশ গেড়ে দিলেন । সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল ! আপনি এরূপ করলেন কেন ? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যে পর্যন্ত ডাল দু’টি শুকিয়ে না যাবে, হয়তো তাদের শাস্তি হ্রাস করা হবে ৷ (সহীহ : বুখারী ২১৮, মুসলিম ২৯২)

উল্লিখিত হাদীসে রাসূল(স:) কবরবাসীর শাস্তি সম্পর্কে যে উক্তি করেছেন তা পূর্বে আল্লাহ তা'য়ালা জানিয়েছেন যাতে আমরা সতর্ক থাকি ৷ অতএব, এরূপ অনেক ঘটনা ও হাদীস রয়েছে যেগুলোর উপর ভিত্তি করে অনেকে মনে করেন যে, রাসূল(স:) গাইয়েব বা অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞান রাখেন (নাউজুবিল্লাহ) ৷ সুতরাং আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন আমাদের ঈমানকে না হারায় এবং নিজেদের আমলকে নষ্ট না করি ৷

উপরিউক্ত স্বল্প বর্ণনায় গায়েব সম্পর্কিত বিষয় স্পষ্টরূপে প্রতিফলিত হয়েছে ৷ অতএব, তারাই উপলব্ধি করতে সক্ষম যারা সত্যকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ৷ দোয়া থাকবে যেন আমার অপর মুসলিম ভাইয়েরা এই মন্দ ধারনা থেকে বেঁচে থাকেন এবং আল্লাহর কোনো ক্ষমতা সম্বলিত গুণের সাথে কাউকে শরীক না করেন ৷

আল্লাহ সবাইকে হেদায়াত দান করুক ৷ আমিন ৷৷

লেখক: আবদুর রশীদ

Comments